চারদিকে ঘন অন্ধকার। একদিকে শ্মশানের নিস্তব্ধতা, অন্যদিকে জ্বলছে চিতার আগুন। সেই শ্মশানভূমিতেই অধিষ্ঠান এক ভয়ংকরী দেবীর। গায়ের রং গাঢ় কালো। মাথায় জটাজুট, কপালে অর্ধচন্দ্র। গলায় পঞ্চাশটি নরমুণ্ডের মালা। হাতে খড়্গ ও নাগপাশ। কানে শবদেহের অলঙ্কার। দেবীর নাম গুহ্যকালী। কালীমূর্তির এই উগ্র রূপ সাধারণত গৃহস্থের বাড়িতে পুজো করা হয় না। তন্ত্রসাধকদের কাছে অবশ্য এই দেবীর মাহাত্ম্য অপরিসীম। কিন্তু কেন সাধারণ মানুষের কাছে অধরা এই দেবীর আরাধনা? কী রয়েছে তাঁর রূপ ও সাধনার নেপথ্যে? (Guhya Kali Temple Bengal)
কালীর নয় রূপের অন্যতম গুহ্যকালী
তন্ত্রশাস্ত্রে দেবী কালীর একাধিক রূপের উল্লেখ রয়েছে। তোড়ল তন্ত্র ও মহাকাল সংহতি অনুসারে, কালী মূলত নয় প্রকার। দক্ষিণাকালী, ভদ্রকালী ও শ্মশানকালীর পাশাপাশি রয়েছে গুহ্যকালীর রূপ। দেবী ভাগবত পুরাণের কাহিনি অনুসারে, শতাক্ষী দেবীর শরীর থেকে গুহ্যকালীর উৎপত্তি। সাধকদের কাছে তিনি আকালী নামেও পরিচিত। সাধারণ মানুষের কাছে এই রূপ অনেকটাই রহস্যে ঘেরা। (Guhya Kali Temple Bengal)
কেন এত ভয়ংকর দেবীর রূপ?
পুরাণের কাহিনি অনুযায়ী, দারুকাসুর বধের পর এক দেবতা মহেশ্বরের শরীরে প্রবেশ করেছিলেন। মহাদেবের কণ্ঠে থাকা হলাহল বিষের নীল রং থেকেই তাঁর গায়ের রং কালো হয়ে যায় বলে কথিত রয়েছে। সেই কারণেই দেবী বিষধরী ও উগ্রচণ্ডী রূপে পরিচিত। গুহ্যকালীর মাথায় জটাজুট ও অর্ধচন্দ্র। কানে শবদেহের অলঙ্কার এবং গলায় নাগবেষ্টিত উপবীত। চারপাশে রয়েছে অসংখ্য নাগফণা। দেবীর বাম দিকে অবস্থান করেন মহেশ্বর। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, দেবী শবমাংস ভক্ষণ করেন। এই ভয়াল রূপের কারণেই সাধারণ গৃহস্থের পুজোয় তাঁর আরাধনা প্রচলিত নয়।
বীরভূমের আকালীপুরে ঐতিহাসিক মন্দির
গুহ্যকালীর সাধনা অত্যন্ত কঠিন বলে মনে করা হয়। লোকশ্রুতি অনুযায়ী, সাধক বামদেব এই দেবীর সাধনায় সিদ্ধিলাভ করেছিলেন। বাংলার বীরভূম জেলার আকালীপুর গ্রাম গুহ্যকালীর আরাধনার জন্য বিশেষ পরিচিত। ব্রাহ্মণী নদীর তীরে শ্মশানের পাশে মহারাজা নন্দকুমার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন গুহ্যকালীর ঐতিহাসিক মন্দির। লোকালয় থেকে কিছুটা দূরে অবস্থিত এই মন্দির ঘিরে আজও রয়েছে নানা রহস্য ও লোককথা। কথিত আছে, অমাবস্যার রাতে সেখানে তন্ত্রসাধকদের আনাগোনা দেখা যায়।
সব মিলিয়ে গুহ্যকালী শুধু দেবী কালীর আরেকটি রূপ নন, বাংলার তন্ত্রসাধনা ও প্রাচীন ধর্মীয় ঐতিহ্যের এক রহস্যময় অধ্যায়। তাঁর উগ্র রূপ এবং সাধনার কঠিন নিয়ম আজও ভক্ত ও গবেষকদের কৌতূহলের বিষয়। (Guhya Kali Temple Bengal)











