কুশল চক্রবর্তী
জীবনের সত্য বলে- চালচলন, গতিপ্রকৃতি শুধু মানুষেরই না একটা কোম্পানিরও হাল হকিতত বলে দেয়। আগামী দিনে ভারতবাসীর ডিজিটাল লেনদেনের কথা চিন্তা করে বিজয় শেখর শর্মা যখন ২০১০ সালে Paytm নামে একটা কোম্পানি চালু করেছিলেন, তখন হয়তো তাঁর উচ্চাকাঙ্ঘার শেষ ছিল না। তখন অবশ্য এই কোম্পানির পিছনে ছিল ওয়ান৯৭ কমিউনিকেশনস বলে একটা কোম্পানি। Paytm তাদের ব্যবসা বাড়াবার জন্য একের পর এক কাজ করে গেছে।
সবচেয়ে বেশী যেটা নজর কেড়েছিল, তা হলো ২০১৬-র ৯ নভেম্বর মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ছবি দিয়ে Paytm-এর বিজ্ঞাপন। এখানে বলে রাখা দরকার যে, ২০১৬ সালের ৮ নভেম্বর কাকপক্ষীকে না জানিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সন্ধ্যা ৮টার সময়ে বিমুদ্রাকরণের ঘোষণা করেছিলেন। তার পরের দিন ভারতের সব বড় বড় সংবাদপত্রে সেই বিজ্ঞাপন দেখে সবাই অবাক হয়ে গিয়েছিল। সারা ভারতব্যাপী একটা কথা উঠে এসেছিল, কী করে একটা প্রাইভেট সংস্থা প্রধানমন্ত্রীর ছবি দিয়ে তাদের ব্যবসাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কাজ করতে পারে?
আরও পড়ুন: সমন্বয়ের অভাব, 15G আর 15H-এর পরিবর্তিত রূপে মুশকিলে গ্রাহকরা
আর কী ভাবেই বা তারা এই বিমুদ্রাকরণের ঘোষণার এত তাড়াতাড়ি সংবাদপত্রে এই বিজ্ঞাপন দেওয়ার বাবস্থা করতে পারে? শুধু এই বিজ্ঞাপন দেওয়াই নয়, এরপরেও এরা জড়িয়ে পড়ে আরও এক বিতর্কিত বিজ্ঞাপন নিয়ে। বিমুদ্রাকরণের পর যখন সারা ভারতবাসী নিদারুণ কষ্টের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে তখন তাঁরা বিজ্ঞাপন দেয়, “ড্রামা বন্ধ করো, Paytm করো”। সারা দেশময় এই বিজ্ঞাপনের বিপক্ষে জনমত এতই তীব্র হয়ে ওঠে যে তাদের বিজ্ঞাপন পাল্টাতে হয়। নতুনভাবে বিজ্ঞাপন দিতে হয় “চিন্তা নাই, Paytm করো”।
এরপর এই Paytm কোম্পানি জড়িয়ে পড়ে সচিন তেন্ডুলকরকে নিয়ে এক বিতর্কিত বিজ্ঞাপন নিয়ে। এই সব কথা একটা জিনিস বুঝিয়ে দিয়েছিল, যে মাথার উপর কোনও “বড় হাত” না থাকলে ভারতীয় শিল্পক্ষেত্রে এমন যথেচ্ছাচার সম্ভব নয়। ২০১৫ সালে তাঁরা যে ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাঙ্কের কাছে থেকে Paytm ব্যাঙ্ক খোলার অনুমতি পেয়েছিল তা কাজে লাগাতে লাগাতে ২০১৭ সাল হয়ে যায়। ইতিমধ্যে প্রধানমন্ত্রীর এই বিমুদ্রাকরণ ভীষণভাবে সাহায্য করে ডিজিটাল লেনদেন বাড়াবার। আর Paytm এই সুযোগে দারুণভাবে বাড়িয়ে নেয় তাদের ব্যবসা।
২০২১ সালে এসে দেখা যায় পেটিএমের গ্রাহক প্রায় ১০ কোটি ছাড়িয়ে গিয়েছে আর আর তাদের মাধ্যমে লেনদেন হচ্ছে ১৫ কোটির বেশী টাকা। তাদের এই সম্প্রসারণ তাদের সঙ্গে জুড়তে সাহায্য করে চিনের আলিবাবা, সফট ব্যাঙ্কেরর মতো কোম্পানিকে। এমনকি এই পেটিএমের সঙ্গে ব্যবাসায়িক সম্পর্কে জড়ায় উবার, ভারতীয় রেল, ওয়ারেন বাফেটের হ্যাথওয়ের মতো কোম্পানিও। এই সময় একে একে বেরিয়ে পড়তে থাকে পেটিএমের নানা ভারতীয় ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণকারী রিজার্ভ ব্যাঙ্কের নিয়ম লঙ্ঘনকারী কাজ। এর মধ্যে আবার Paytm বাজারে নিয়ে এসেছে তাদের শেয়ার। সেই শেয়ারের দাম নিয় উঠে আসে নানা প্রশ্ন। ২১৫০ টাকা মূল্যের শেয়ার বাজারে খোলে ১৯৫৫ টাকায়। আজকের দিনে পেটিএম শেয়ারের দাম এসে ঠেকেছে ১১৫২ টাকায়।
আরও পড়ুন: ভারতের অর্থনীতি নেমে গেল বিশ্বের ছয় নম্বরে, কেন এই পতন?
কিন্তু ২০২৪ সালে এসে পেটিএমের গ্রহকদের পরিচয় নিয়ে নানা প্রশ্ন ওঠায় রিজার্ভ ব্যাঙ্ক তাদের ব্যবসার উপর নানা নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে। এছাড়াও ছিল পেটিএম কোম্পানির রিজার্ভ ব্যাঙ্কের নানা নির্দেশের প্রতি অবজ্ঞা। অবশেষে গত ২৪ এপ্রিল রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া Paytm Payments Bank-এর লাইসেন্স বাতিল করল। চিন্তায় পড়ল লক্ষ লক্ষ গ্রাহক, যারা কিনা পেটিএমের ওয়ালেটে টাকা রাখত। তাদের টাকার কী হবে? আর যারা পেটিএমের শেয়ার কিনেছিল তাদের তো ঝুঁকি ছিলই। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে একের এক প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ছবি দিয়ে পেটিএম যে গ্রাহকের আস্থা অর্জন করেছিল সেটা নিয়ে কি প্রশ্ন তোলা যাবে?
প্রশ্ন কি তোলা যাবে কি করে একের পর এক চিনা কোম্পানি এই পেটিএমের সঙ্গে এতখানি সখ্যতা বাড়াল, তা নিয়ে?












