আদিবাসী সমাজের অন্যতম শ্রেষ্ঠ উৎসব করম পুজো। করম পুজো হলো মূলত প্রকৃতি ও শস্য উৎপাদনের একটি প্রধান উৎসব, যা শক্তি, যৌবন ও তারুণ্যের দেবতা ‘করম-দেবতা’-র আরাধনায় পালিত হয়। ভালো ফসল, সুস্বাস্থ্য এবং পরিবারের মঙ্গল কামনায় এই পুজো করা হয়। প্রতিবছর ভাদ্র মাসের শুক্লপক্ষের একাদশী তিথিতে এই উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। সেই হিসেবে আজ, অর্থাৎ ২২ সেপ্টেম্বর করম পুজো (karam puja)।
karam puja: কারা পালন করেন?
ঝাড়খণ্ড, পশ্চিমবঙ্গ, ওডিশা, ছত্তিশগড়, বিহার ও অসমের বিভিন্ন আদিবাসী সম্প্রদায় এই উৎসব পালন করেন। ওঁরাও, মুণ্ডা, সাঁওতাল, হো, খাড়িয়া এবং কুড়মি সহ নানা জনজাতি এই পরবের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। গ্রামের অবিবাহিত তরুণী ও নারীরা কৃষিকাজে উন্নতি এবং ভাইয়ের মঙ্গল এবং সুস্থ জীবনের কামনায় এই ব্রত পালন করে নাচ-গান করেন (karam puja)।
কেন করা হয় এই পুজো?
কৃষি ও ভালো ফসল: এটি মূলত একটি কৃষিভিত্তিক উৎসব। কৃষিজমিতে ভালো ফলন ও শস্যবৃদ্ধির আশায় এবং প্রকৃতি যাতে অনুকূল থাকে, সেই প্রার্থনা করা হয়।
প্রকৃতি পূজা: করম গাছকে (শক্তি ও প্রাণশক্তির প্রতীক) পবিত্র মনে করে পুজো করা হয়। এর মাধ্যমে প্রকৃতির প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়।
ভাইয়ের মঙ্গল কামনায়: এই রাজ্যের অনেক অঞ্চলে আদিবাসী বোনেরা তাদের ভাইয়ের দীর্ঘায়ু, সুখ ও সমৃদ্ধির জন্য উপোস রেখে এই ব্রত পালন করেন।
বংশবৃদ্ধি ও সমৃদ্ধি: করম দেবতাকে ধন-সম্পদ, সন্তান ও পরিবারের কল্যাণদাতা হিসেবে পুজো করা হয়।
সামাজিক ঐক্য: এই উৎসবের মাধ্যমে সমাজের মানুষের মধ্যে সৌহার্দ্য, বন্ধুত্ব, ভ্রাতৃত্ববোধ এবং সাংস্কৃতিক ঐক্য গড়ে ওঠে।
এই পুজোর মাহাত্ম্য কী?
আদিবাসী সম্প্রদায়ের এই করম পুজো নিয়ে এক পৌরাণিক গল্প প্রচলিত রয়েছে। করম ও ধরম রাজার গল্প আদিবাসী সমাজে প্রচলিত। কীভাবে তারা সংকটের মুখে পড়ে এই পুজো করার পর উদ্ধার হয়েছিলেন, সেই গল্প শোনানো হয় এই পুজোতে। কী সেই গল্প? কোনও এক গ্রামে করম ও ধরম নামে দুই ভাই বাস করত। তারা চাষবাস করে সুখে ও শান্তিতে দিন কাটাচ্ছিল এবং নিয়ম করে প্রতিবছর করম ঠাকুরের পুজো করত।
এক বছর করম পুজোর পরের দিন, পুজোর নিয়ম ঠিকমতো মানতে পারেনি দুই ভাই। যার কারণে ক্রুদ্ধ হন প্রকৃতির ও কর্মের দেবতা করম ঠাকুর। দেবতার কোপে মুহূর্তের মধ্যে দুই ভাইয়ের সংসার তছনছ হয়ে যায়। তাদের ক্ষেতের ফসল নষ্ট হয়ে যায়। গোলায় ধান ফুরিয়ে যায় এবং তাঁরা চরম দারিদ্র্য ও অনশনের মুখে পড়ে। উপায় না পেয়ে এবং নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে দুই ভাই পুনরায় করম দেবতার আরাধনা ও পুজো শুরু করে। তখন করম দেবতা সন্তুষ্ট হয়ে তাদের সমস্ত হারানো সুখ-সমৃদ্ধি, ফসল ও সচ্ছলতা ফিরিয়ে দেন।
অন্যদিকে, নদী বা জলাশয়ে করম বিসর্জনের অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়। ভোর থেকে করম গাছ নিয়ে আদিবাসী যুবক, যুবতীরা চলে আসেন নদীগুলিতে। শুধু আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষেরা না এই বিসর্জন দেখতে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ ভিড় জমান।









