ইরান যুদ্ধের বিস্তার রুখতে বড় কূটনৈতিক সাফল্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের। দীর্ঘ আলোচনার পর ইজরায়েল ও লেবানন নতুন যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হলেও পরিস্থিতি এখনও অস্থির। (Israel Lebanon Ceasefire) চুক্তির ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই দক্ষিণ লেবাননে ড্রোন ও বিমান হামলা চালায় ইজরায়েল, পাল্টা হামলার দাবি করে হেজবুল্লাও। ফলে যুদ্ধবিরতির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
ওয়াশিংটনে একাধিক দফার আলোচনার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ঘোষণা করেছে, ইজরায়েল ও লেবানন শত্রুতা রুখতে একটি নতুন যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে সম্মত হয়েছে। তবে এই চুক্তি কার্যকর হওয়ার অন্যতম প্রধান শর্ত হলো ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র সংগঠন হেজবুল্লার সম্পূর্ণভাবে গোলাবর্ষণ বন্ধ করা এবং তাদের লোকদের দক্ষিণ লেবাননের লিটানী নদীর দক্ষিণাঞ্চল থেকে সরিয়ে নেওয়া।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টের প্রকাশিত যৌথ বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, চুক্তিটি ইজরায়েল ও লেবানন সরকারের মধ্যে স্বাক্ষরিত হলেও বাস্তবে সংঘর্ষটি ছিল ইজরায়েল ও হেজবুল্লার মধ্যে। লেবাননের সেনাবাহিনী সরাসরি এই যুদ্ধে জড়িত নয়। তবে হজবুল্লার প্রভাব কমিয়ে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে লেবানন সরকার সংগঠনটিকে পাশ কাটিয়ে ইজরায়েলের সঙ্গে আলোচনা চালিয়েছে।
(Israel Lebanon Ceasefire) যুদ্ধবিরতির ঘোষণা এলেও বাস্তবে কিন্তু সংঘর্ষ থামেনি। বৃহস্পতিবার সকালেও দক্ষিণ লেবাননের নাবাতিহ এলাকা এবং পশ্চিম বেকা উপত্যকায় একাধিক বিমান হামলা চালায় ইজরায়েল। অন্যদিকে হেজবুল্লা দক্ষিণ লেবাননের কানতারা গ্রামে অবস্থানরত ইজরায়েলি সেনাদের লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে।

ইজরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইজরায়েল কাটজ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, দক্ষিণ লেবাননে ‘সন্ত্রাসী অবকাঠামো’ ধ্বংসের অভিযান অব্যাহত থাকবে। তাঁর দাবি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন নিয়ে প্রয়োজনে বেইরুটেও হামলা চালানোর স্বাধীনতা রয়েছে ইজরায়েলের। একইসঙ্গে তিনি জানান, উত্তর ইজরায়েলের বাসিন্দাদের নিরাপত্তার স্বার্থে দক্ষিণ লেবাননে তৈরি করা বাফার জোনে ইজরায়েলি সেনা মোতায়েন থাকবে।
বর্তমানে দক্ষিণ লেবাননের ৬০০ বর্গ কিলোমিটারেরও বেশি এলাকা ইজরায়েলের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। যুদ্ধ চলাকালীন সীমান্তবর্তী বহু গ্রাম ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় এখনও শত শত লেবানন নাগরিক নিজেদের বাড়িতে ফিরতে পারেননি। (Israel Lebanon Ceasefire)
(Israel Lebanon Ceasefire) চুক্তির অংশ হিসেবে উভয় দেশ কয়েকটি ‘পাইলট জোন’ তৈরিতে সম্মত হয়েছে। এসব এলাকায় শুধুমাত্র লেবাননের সশস্ত্র বাহিনী নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখবে এবং কোনও অ-রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীর উপস্থিতি থাকবে না। লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন জানিয়েছেন, প্রথম পাইলট জোন হিসেবে বিউফোর্ট ক্যাসল সংলগ্ন এলাকা বেছে নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি। সম্প্রতি ওই এলাকা দখল করেছে ইজরায়েলি বাহিনী।
তবে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হতে অন্তত ২৪ ঘণ্টা সময় লাগতে পারে বলে জানিয়েছেন আউন। এখন সবার নজর হেজবুল্লার প্রতিক্রিয়ার দিকে। সংগঠনটির মহাসচিব নাইম কাসেম শীঘ্রই এই বিষয়ে বক্তব্য রাখবেন বলে জানা গিয়েছে।
এর আগে হেজবুল্লার এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানিয়েছিলেন, তারা কোনও ‘আংশিক যুদ্ধবিরতি’ মেনে নেবে না। যদিও সূত্রের খবর, সম্পূর্ণ যুদ্ধবিরতির বিষয়ে সংগঠনটি নীতিগতভাবে আপত্তি করছে না, যদি ইজরায়েলও হামলা বন্ধ রাখে। তবে বৃহস্পতিবারের হামলার পর তাদের অবস্থান কী হবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়।

এই চুক্তিতে ইজরায়েলি সেনা আদৌ দক্ষিণ লেবানন থেকে প্রত্যাহার হবে কি না, সে বিষয়ে কোনও উল্লেখ নেই। এর আগে ১৭ এপ্রিলও একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু উভয় পক্ষ একে অপরের বিরুদ্ধে চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে হামলা চালিয়ে যায়।
উল্লেখযোগ্যভাবে, গত মার্চ মাসে ইরানের সমর্থনে হেজবুল্লা ইজরায়েলের বিরুদ্ধে হামলা শুরু করার পর থেকেই উত্তেজনা চরমে ওঠে। সেই প্রেক্ষাপটে ওয়াশিংটনে এটি ছিল লেবানন ও ইজরায়েলের কূটনীতিকদের মধ্যে চতুর্থ দফার সরাসরি বৈঠক।
চুক্তির কাঠামো অনেকটাই ২০২৪ সালের যুদ্ধবিরতি চুক্তির মতো। সেবারও হেজবুল্লা লিতানি নদীর উত্তরে সরে যেতে রাজি হয়েছিল। কিন্তু তাদের পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ হয়নি। পরবর্তী ১৫ মাসে ইজরায়েল ১০ হাজারেরও বেশি হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে।
এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্পষ্ট করেছেন, তিনি লেবানন সংঘাত এবং ইরান যুদ্ধের আলোচনা আলাদা রাখতে চান। তবে তেহরান মনে করে দুই ইস্যু পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। (Israel Lebanon Ceasefire) ইরান ইতিমধ্যেই হুঁশিয়ারি দিয়েছে, লেবাননে ইজরায়েলি অভিযান চলতে থাকলে ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনাও প্রভাবিত হতে পারে।
সোমবার ট্রাম্প জানান, তিনি বৈরুতে একটি আসন্ন ইজরায়েলি হামলা ঠেকিয়েছেন এবং প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ও হেজবুল্লার প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলেছেন। তাঁর কথায়, “সব ধরনের গুলি চালানো বন্ধ হবে” বলে আশ্বাস মিলেছিল। এমনকি নেতানিয়াহুকে ‘কিছুটা পাগলাটে’ বলার খবরও কার্যত স্বীকার করেন ট্রাম্প। তাঁর মতে, হেজবুল্লার বিরুদ্ধে ইজরায়েলের অভিযান ইরানের সঙ্গে শান্তি আলোচনাকে জটিল করে তুলছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের সঙ্গে কোনও বৃহত্তর শান্তি চুক্তি হওয়ার আগে হেজবুল্লাকে যতটা সম্ভব দুর্বল করে দিতে চাইছে ইজরায়েল। অন্যদিকে নেতানিয়াহু জানিয়েছেন, হেজবুল্লাকে নিরস্ত্র করাই ইজরায়েল ও লেবাননের মধ্যে স্থায়ী শান্তির পথ খুলে দিতে পারে।
এদিকে ইরান যুদ্ধ ঘিরে ট্রাম্পের উপর চাপও বাড়ছে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক চাপ রিপাবলিকানদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। এরই মধ্যে মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে এক প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে, যাতে ট্রাম্পকে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হলে কংগ্রেসের অনুমোদন নিতে হবে অথবা মার্কিন সেনা প্রত্যাহার করতে হবে।

অন্যদিকে দক্ষিণ লেবাননে হাসপাতাল ও অ্যাম্বুল্যান্সের কাছাকাছি ইজরায়েলি হামলায় একাধিক প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রকের দাবি, একটি অ্যাম্বুল্যান্সে হামলায় দুই প্যারামেডিক নিহত হয়েছেন। মানবাধিকার সংগঠনগুলির মতে, স্বাস্থ্যকর্মীদের উপর হামলা আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘন এবং যুদ্ধাপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে।
ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ থামাতে ট্রাম্পের বিরুদ্ধেই রিপাবলিকানদের ভোট












2 thoughts on “নামেই যুদ্ধবিরতি, থামেনি ইজরায়েল-লেবানন সংঘর্ষ”