কুশল চক্রবর্তী
ঘর পোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলেই ভয় পায়। বাংলার বহু প্রচলিত প্রবাদ এটা। চির সত্য কথাই একদিন প্রবাদে প্রমাণিত হয়। সারা দেশের আপামর জনতা জানে জ্বালানির দাম বাড়লে কী অসুবিধায় পড়তে হবে (Petrol Diesel Price)। একদিকে ইরানের সঙ্গে আমেরিকা আর ইজরাইলের যুদ্ধ আর আরেক দিকে পাঁচ রাজ্যের নির্বাচন, কেন্দ্রীয় সরকারকে হয়তো একটু ব্যস্ত করে তুলেছিল। তাই ৪ মে-র পরে পেট্রোল ও ডিজেলের দাম বাড়ছে বলে বাজারে কথা উঠতেই কেন্দ্রীয় সরকার অস্বীকার করেছে এই দাম বাড়ার ব্যাপারটা। কিন্তু ইতিহাস যে অন্য কথাই বলে।
২০০৪ সালের কথা ধরা যাক। ২২ মে ভারতের UPA সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসাবে শপথ নিলেন মাননীয় মনমোহন সিং। তারপর কিছুদিনের মধ্যেই বাড়তে আরম্ভ করল জ্বালানির দাম। মূলত পেট্রোল আর ডিজেলের কথাই বলা হচ্ছে। জুন মাস থেকে নভেম্বর মাসের মধ্যে ধাপে ধাপে পেট্রলের দাম প্রায় ৬ টাকা আর ডিজেলের দাম প্রায় ৬ টাকা ৫০ পয়সা বেড়ে গেল। সরকার বাহদুর বললেন বহির্বিশ্বে অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়ার জন্য আমাদের বাধ্য হয়ে দাম বাড়াতে হয়েছে। কিন্তু ভারতের আপামর জনতার কষ্ট বেড়েছিল বৈ কমেনি।
অনেক প্রশ্নের উত্তর না দিয়েই Paytm Payments Bank-এর লাইসেন্স বাতিল করল রিজার্ভ ব্যাঙ্ক
আসুন দেখা যাক, ২০১৯ সালের কথা। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী লোকসভার নির্বাচন জিতে শপথ নিলেন ৩০ মে ২০১৯। দ্বিতীয়বারের জন্য প্রধানমন্ত্রীর চেয়ারে বসলেন। তারপর থেকে পেট্রোল আর ডিজেলের দাম ক্রমাগত বাড়তে থাকল। ২০১৯ সালে যে পেট্রলের দাম ছিল ৭৩.৮৩ টাকা প্রতি লিটার, তা ২০২১ সালে এসে দাঁড়াল ৯৫.৪০ টাকায়। মজার কথা হচ্ছে এই যে, যতবারই তেলের দাম বেড়েছে, ততবারই যারা কি না বিরোধী পক্ষে থেকে তার প্রতিবাদ করেছে। অর্থাৎ কি না লোকসভায় ২০০৪ সালে NDA-র সদস্যরা তেলের দাম বাড়াবার জন্য গলা ফাটিয়েছিলেন। আবার যখন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর আমলে তেলের দাম বেড়েছে, তখন দেখা গিয়েছে ইউপিএর সদস্যরা লোকসভায় তীব্র প্রতিবাদ করেছেন।
এবার আসা যাক ২০২১ সালের পশ্চিমবঙ্গ, তামিলনাড়ু, কেরালা, পন্ডিচেরি আর অসম নির্বাচনের কথায়। সেবারও দেখা গিয়েছিল একই ব্যাপার। ভোটের আগে কেন্দ্রীয় সরকার ১৩৭ দিন ধরে পেট্রোল ডিজেলের দাম এক জায়গায় ধরে রেখেছিলেন। বুঝতেই পারছেন ভোট বড় বালাই। নির্বাচন শেষ হতেই আরম্ভ হয়েছিল তেলের দাম বাড়ানোর প্রক্রিয়া। এই নিয়ে সরকার বলেছিলেন যে, অপরিশোধিত তেলের দাম ১০০ ডলার প্রতি ব্যারেল ছাড়িয়ে যাওয়ায় সরকারের আর উপায় ছিল না তেলের দাম না বাড়িয়ে। মাজাটা কী জানেন, এই ১৩৭ দিনের মধ্যে কিন্তু তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১৪০ ডলার ছাড়িয়ে গিয়েছিল, কিন্তু সরকার বাহাদুর তখন তেলের দাম বাড়াননি। ভোট বাক্সে যদি তার প্রভাব পড়ে, সে চিন্তাই ছিল বেশী।
এবার মানে ২০২৬ সালেও এখন চলেছে পাঁচটি রাজ্য মানে পশ্চিমবঙ্গ, অসম, কেরালা, তামিলনাড়ু আর পন্ডিচেরির নির্বাচন। সারা বিশ্ব জুড়ে অপরিশোধিত তেল নিয়ে চিন্তা। কারণ, ইরান আর যুক্তরাষ্ট্র এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার ফলে, তেল নিয়ে নানা রকমের প্রশ্ন উঠে আসছে। এর মধ্যে তেলের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা রান্নার গ্যাসের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার। সাধারণ মানুষের রান্নার কাজে ব্যবহৃত হওয়া ১৪.০২ কেজির গ্যাসের দাম বেড়েছে ৬০ টাকা আর বাণিজ্যিক কাজে লাগা গ্যাসের দাম বেড়েছে ১১৫ টাকা থেকে ১৯৫ টাকা, কিন্তু পেট্রোল বা ডিজেলের দাম এতটুকুও বাড়েনি। অন্যদিকে বিশ্ববাজারে কিন্তু অপরিশোধিত তেলের দাম জানুয়ারি থেকে এপ্রিল অবধি ৬৭ ডলার ব্যারেল থেকে ১০৮ ডলার ব্যারেল অবধি ওঠানামা করেছে।
South Korea UPI: দক্ষিণ কোরিয়ায় চালু হচ্ছে UPI, আন্তর্জাতিক লেনদেনে বড় সাফল্য ভারতের
কিন্তু হয়তো পাঁচ রাজ্যের নির্বাচনের কথা ভেবে পেট্রোল ডিজেলের দাম একবারও বাড়ায়নি কেন্দ্রীয় সরকার। ইতিহাসকে সাক্ষী রাখলে এটা কিন্তু বলতেই হবে যে আগামী দিনগুলোতে আপামর ভারতবাসীকে চিন্তাতেই থাকতে হবে। কারণ তারা তো এখন হাড়ে হাড়ে বুঝছে কোন “প্রতিশ্রুতির” কী মূল্য!












