সম্প্রতি নেপাল-চিন সীমান্তে হিমবাহ ধসের ফলে সৃষ্ট ভয়াবহ বন্যার পর এবার ভারতের হিমালয় নিয়েও বাড়ছে উদ্বেগ। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, ভারতীয় হিমালয়ে বড় কোনও হিমবাহ ধসে পড়লে কিংবা হিমবাহের হ্রদ থেকেও নেমে আসতে পারে ভয়াবহ জলস্রোত। আর যদি এমনটা ঘটে তবে সেই দুর্যোগ হবে নেপালের থেকেও ভয়ংকর। তাতে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রাও নেপালের সাম্প্রতিক ঘটনাকে ছাপিয়েও যেতে পারে।
এই প্রসঙ্গে জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা কর্তৃপক্ষ (NDMA)-এর সদস্য তথা প্রবীণ বিজ্ঞানী দীনেশ কুমার আসওয়াল জানিয়েছেন, উত্তর-পূর্ব থেকে পশ্চিম, ভারতের হিমালয়জুড়ে রয়েছে অসংখ্য হিমবাহ। এর অনেকগুলিই ৫ হাজার মিটারের বেশি উচ্চতায় অবস্থিত। সেখানে জমে রয়েছে বিপুল পরিমাণ বরফ ও জল। কোনও হিমবাহ হঠাৎ ভেঙে পড়লে বা হিমবাহের হ্রদ ফেটে গেলে অল্প সময়ের মধ্যেই সেই জল ভয়ঙ্কর গতিতে নীচের দিকে নেমে আসতে পারে। যার ফলে পাহাড়ের পাদদেশে ভয়ংকর বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
Warning for India: নদীর জায়গা দখলেই বাড়ছে ঝুঁকি
তবে শুধু প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের জন্যই নয়, হিমালয়ের পার্বত্য অঞ্চলে মানুষের গতিবিধির উপরেও ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা অনেকটাই নির্ভর করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন নেপালের সাম্প্রতিক ঘটনার মতো যদি, নদীর খুব কাছাকাছি বহু মানুষের বসবাস থাকে তাহলে বিপর্যয়ের প্রভাব আরও ভয়াবহ হবে। পাহাড়ি এলাকায় জলের সহজলভ্যতা এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হওয়ায় নদী উপত্যকাগুলিতে গত কয়েক বছরে জনবসতি বেড়েছে। এমনকি বন্যার সময় নদীর জল যে এলাকায় স্বাভাবিক ভাবে ছড়িয়ে পড়ে, সেই জায়গাতেও অনেক ক্ষেত্রে বসতি ও নির্মাণ হয়েছে। নদীর গতিপথে বাধা দিলে সেখানে বন্যার প্রকোপ বেশি হবেই।
‘১০০০ বছরের’ বন্যার হিসাব জরুরি
এই ঝুঁকি কমাতে হিমালয় সংলগ্ন রাজ্যগুলিতে বিস্তারিত বন্যা-ঝুঁকির মানচিত্র তৈরির পরামর্শ দিয়েছেন বিজ্ঞানী আসওয়াল। তাঁর মতে, প্রায় ১,০০০ বছরে নদীর সর্বোচ্চ জলস্তর কতটা উঠেছে, সেই তথ্য বিশ্লেষণ করে ভবিষ্যতে বন্যায় কোন কোন এলাকা প্লাবিত হতে পারে, তা চিহ্নিত করা দরকার। সেই অনুযায়ী বিপজ্জনক এলাকায় বসতি ও নির্মাণ নিয়ন্ত্রণ করা গেলে প্রাণহানি ও সম্পত্তির ক্ষতি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
হিমবাহের হ্রদ চিহ্নিত করা ও নজরদারির কাজ ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে। হায়দরাবাদের ন্যাশনাল রিমোট সেন্সিং সেন্টার (NRSC) উপগ্রহচিত্রের সাহায্যে হিমবাহের হ্রদগুলির মানচিত্র তৈরি করেছে। কেন্দ্রীয় জল কমিশনও (CWC) নজরদারি চালাচ্ছে। উত্তরাখণ্ডে ওয়াডিয়া ইনস্টিটিউটকে হিমবাহের হ্রদ চিহ্নিত ও পর্যবেক্ষণের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। হিমাচল প্রদেশ, সিকিম এবং জম্মু-কাশ্মীরেও রয়েছে ঝুঁকি পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা। (Warning for India)
পচা মাংস, দেওয়ালের রং দিয়ে তৈরি বিরিয়ানি! কলকাতার ৪০টি রেস্তোরাঁর লাইসেন্স বাতিল
তবে শুধু হ্রদ চিহ্নিত করাই যথেষ্ট নয়। কোন হ্রদ বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। হ্রদের আয়তন কত দ্রুত বাড়ছে, জল আটকে রাখা মোরেন বা প্রাকৃতিক বাঁধ কতটা শক্তিশালী—এসব নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
আগাম সতর্কতা অবলম্বনই
শেষ ভরসাআচমকা বন্যার ক্ষেত্রে কয়েক মিনিটের ব্যবধানও মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে পারে। তাই নজরদারির পাশাপাশি দ্রুত সতর্কবার্তা পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা জরুরি। বিজ্ঞানী আসওয়ালের মতে, নেপালের ঘটনায় জল অত্যন্ত দ্রুতগতিতে নেমে এসেছিল। কিন্তু খবর পৌঁছেছিল দেরিতে। আরও আগে নীচের জনবসতিতে পৌঁছলে বহু মানুষ নিরাপদ জায়গায় সরে যাওয়ার সুযোগ পেতেন।
বর্তমানে প্রায় ৭৭৭টি জেলার জন্য জেলা বিপর্যয় মোকাবিলা পরিকল্পনা রয়েছে এবং প্রতিটি জেলায় Disaster Emergency Operations Centre রয়েছে। এবার একই ধরনের জরুরি ব্যবস্থা ব্লক স্তরেও তৈরি করার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন তিনি। কারণ স্থানীয় স্তরে দ্রুত খবর পৌঁছলে উদ্ধার ও ত্রাণের কাজও দ্রুত শুরু করা সম্ভব। (Warning for India)
একদিকে বিশ্বউষ্ণায়ন, গলছে হিমবাহ, একইসঙ্গে বাড়ছে বিপদের আশঙ্কা। তাই ভবিষ্যতের বড় বিপর্যয় ঠেকাতে এখন থেকেই বিজ্ঞানভিত্তিক নজরদারি, নিরাপদ ভূমি-ব্যবহার, আগাম সতর্কতা এবং দ্রুত যোগাযোগের ওপর জোর দেওয়ার পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের। নাহলে অদূর ভবিষ্যতে ভারতের বুকেও নেমে আসতে পারে নেপালের মতো ভয়াবহ বিপর্যয়।












2 thoughts on “হিমালয়ে আসছে ‘১০০০ বছরের বন্যা’, নেপালের পর ভারতকেও সতর্কবার্তা”