ভোট গণনার আগে রাজ্যবাসী এবং দলীয় কর্মীদের উদ্দেশ্যে ভিডিয়ো বার্তা দিয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তারপর কেটে গেছে অনেকগুলো দিন। পরিবর্তন এসেছে এই বাংলায়। এবার ফের রাজ্যের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, নির্বাচন প্রক্রিয়া, প্রশাসনিক ভূমিকার মতো একাধিক অভিযোগ তুলে সমাজ মাধ্যমে একটি ভিডিয়ো বার্তা প্রকাশ করলেন রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। (Mamata Banerjee Live)
রবিবার সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশিত একটি দীর্ঘ ভিডিয়ো বার্তায় তিনি দাবি করেন, গত ২০ দিন মুখ বুঝে সব সহ্য করছেন। তাঁর অভিযোগ, বহু মানুষ খুন হয়েছেন, অনেককে জোর করে পদত্যাগ করানো হয়েছে এবং কলকাতা পুরসভাকেও স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে দেওয়া হচ্ছে না। নিজের প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার প্রসঙ্গ টেনে মমতা বলেন, তিনি জানেন প্রশাসন ও দল কীভাবে কাজ করে। তাঁর আমলে ৩০ শতাংশ পঞ্চায়েত বিরোধীদের হাতে থাকলেও কখনও তাঁদের কাজ বন্ধ করা হয়নি। পাশাপাশি কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, ‘পাঁচ বছর ধরে বাংলার প্রাপ্য টাকা আটকে রাখা হয়েছিল এবং কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীকে ব্যবহার করে বিরোধীদের উপর চাপ তৈরি করা হয়েছে।
‘নির্বাচন প্রক্রিয়ার অস্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তৃণমূল নেত্রীর দাবি করেন, “এটা কি সত্যিই ভোট হয়েছে, নাকি ভোটের নামে প্রহসন?” তাঁর অভিযোগ, “লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি” দেখিয়ে প্রায় এক কোটি ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে, কাউন্টিং সেন্টারে রিগিং হয়েছে এবং বিজেপির লোকজন কেন্দ্রীয় বাহিনীর পোশাক পরে সেখানে ঢুকে পড়েছিল। বিরোধী দলের এজেন্টদের আইডি কার্ড কেড়ে নেওয়া হয়েছিল বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তৃণমূল নেত্রীর দাবী নির্বাচনের ২০০ র বেশি আসন পাওয়ার কথা ছিল, কিন্তু ফলাফল ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাঁর প্রশ্ন, “যদি সত্যিই জিতে থাকতেন, তাহলে মানুষের মধ্যে আনন্দ নেই কেন?” (Mamata Banerjee Live)
নাম না করে বর্তমান মুখ্যমন্ত্রীকেও নিশানা করে মমতা। বলেন, “যিনি গদিতে বসেছেন তার নাম নিতে ভালো লাগে না, অনেক দিন ধরে চিনি।” বর্তমান প্রশাসনকে কটাক্ষ করে তিনি বলেন, “আজ রক্ষক হয়ে গিয়েছে ভক্ষক।” ২০১১ সালে ক্ষমতায় এসে রবীন্দ্রসংগীত বাজানোর নির্দেশ দেওয়ার প্রসঙ্গ তুলে তিনি আক্ষেপ করেন, এবার নাকি ঠিকমতো রবীন্দ্রজয়ন্তীও পালন হয়নি।
কলকাতা পুরসভা নিয়ে একাধিক অভিযোগ তুলে মমতা বলেন, রোজ কাউন্সিলরদের গ্রেফতার করা হচ্ছে। যারা রাস্তায় “চোর চোর” স্লোগান দিচ্ছে তারা সবাই বহিরাগত, বাংলার সংস্কৃতি বোঝে না বলেই বুলডোজার চালাচ্ছে। তাঁর অভিযোগ, মেয়র বা চেয়ারম্যান কিছু না জানলেও কর্পোরেশন গায়ের জোরে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, শুনানির সুযোগ না দিয়েই সাধারণ মানুষের ঘরবাড়ি ভেঙে দেওয়া হচ্ছে।
সম্প্রতি যুবভারতীর সামনে থাকা মূর্তি সরানোর কথা জানিয়েছিলেন রাজ্যের ক্রীড়া মন্ত্রী নিশীথ প্রামাণিক। সেই নির্দেশমতো কাজও হয়েছে। এদিন সেই প্রসঙ্গ তুলে মমতা বলে, ক্রীড়াপ্রেমীদের আবেগের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি মূর্তি ভেঙে ফেলা হলো। ফিফা পর্যন্ত যে মূর্তির প্রশংসা করেছিল, শুধুমাত্র তাঁর উপর রাগের কারণে সেটি ভেঙে দেওয়া হয়েছে।
3D পদক্ষেপের পর এবার হোল্ডিং সেন্টার, অনুপ্রবেশকারীদের শায়েস্তা করতে মাস্টারস্ট্রোক নবান্নর
ভিডিয়ো বার্তায় সরকারি প্রকল্প নিয়েও তোপ দাগেন মমতা। তাঁর অভিযোগ, লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের সুবিধা বহু মানুষ পাচ্ছেন না, বাজেটে ডিএ ও পে কমিশনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও বাস্তবে কিছু হয়নি। “পুরনো মদ নতুন বোতলে রাখা হচ্ছে,” বলেও কটাক্ষ করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর বিদেশ সফর এবং সরকারি খরচ নিয়ে আক্রমণ শানিয়ে মমতা বলেন, “চকোলেট ইতালির প্রধানমন্ত্রীকে না দিয়ে বাচ্চাদের দিতে পারতেন।” জ্বালানি সাশ্রয়ের কথা বললেও বিদেশ ভ্রমণ করা এবং মানুষকে সোনা বা গাড়ি ব্যবহার না করার উপদেশ দেওয়ারও সমালোচনা করেন তিনি। (Mamata Banerjee Live)
এদিন রাজ্যের বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর দাবি, এখন মেয়েরা সন্ধ্যার পর ঘর থেকে বেরোতে ভয় পাচ্ছেন, আগে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হলেও এখন মানুষ বেরোচ্ছে না। সাউন্ড ডেসিবেল ইস্যুতে প্রশাসন চাইলে সকলের জন্য এক নিয়ম করতে পারত বলেও মত প্রকাশ করেন তিনি।
ভোট পরবর্তী অশান্তির জেরে তৃণমূলের দলীয় অফিস ভাঙচুরের অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, বড়িশা ক্লাবের সঙ্গে যুক্ত সুদীপ পোল্লে পহেলগাঁওয়ের নিহতদের পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, অথচ তাঁকেই গ্রেফতার করা হয়েছে।
নিজের দলের অন্দরের ভাঙন প্রসঙ্গ টেনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “যারা বেনোজলে ভেসে আসে তাদের ভেসে যেতে দিন। এতে দলেরই ভালো। এদেরকে টার্গেট করে বিজেপি ঢুকিয়েছিল, এবার বিজেপি বুঝে নিন।” বিরোধী দলের মর্যাদা নিয়েও প্রশ্ন তুলে মমতা বলেন, একসময় ২৯ আসন পেয়েও বিরোধী দলের স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি, অথচ এখন ৭৯ জন বিধায়ক থাকা সত্ত্বেও বিরোধী দলনেতা ও প্রাক্তন অধ্যক্ষকে বারান্দায় বসতে হচ্ছে। (Mamata Banerjee Live)
সবশেষে প্রশাসনের উদ্দেশে কড়া বার্তা দিয়ে তিনি বলেন, “আমি প্রশাসনের বিরোধী নই। আপনারা আইনের রক্ষক। কিন্তু আইন ভাঙলে আপনাদেরও আইনের মধ্যে পড়তে হবে।” এরপরই তিনি বলেন, “আমিও দেখব, সংবিধান বড় নাকি বন্দুকের নল বড়।”









