সুন্দরবন ও সংলগ্ন এলাকার মানুষের জীবিকার সঙ্গে জঙ্গলের গভীর সম্পর্ক (Sundarbans Tiger Widows)। মধু, মাছ, কাঁকড়া সংগ্রহ করেই এই অঞ্চলের বহু পরিবারের পেট চলে। তবে এই জঙ্গল শুধু জীবিকা দেয় না, কখনও কখনও কেড়েও নেয় আরও মূল্যবান কিছু। জীবিকার তাগিদে জঙ্গলে গিয়ে অনেকেই আর বাড়ি ফেরেন না। বিশেষ করে বাঘের হামলায় বহু পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম পুরুষ সদস্যের মৃত্যু হয়। আর সেই সব স্বামীকে বাঘের হামলায় হারানো মহিলারা তকমা পান ‘টাইগার উইডো’ বা ‘বাঘ-বিধবা’র (Sundarbans Tiger Widows)।
Table of Contents
কিন্তু এবার সেই মহিলারাই উঠে পড়ে লেগেছেন সুন্দরবনের জঙ্গল বাঁচাতে। যে জঙ্গলে তাঁরা স্বামীকে হারিয়েছেন, সেই জঙ্গলেই ম্যানগ্রোভ গাছ লাগাচ্ছেন তাঁরা। দক্ষিণ ২৪ পরগনার ঝড়খালিতে স্থানীয় মহিলাদের সঙ্গে মিলে প্রায় ১০০ হেক্টর ক্ষতিগ্রস্ত ম্যানগ্রোভ এলাকা পুনরুদ্ধারের কাজ শুরু হয়েছে। লক্ষ্য এক লাখ ম্যানগ্রোভের চারা রোপণ। শুনতে অবাক লাগলেও পিছনের গল্পটা আরও বিচিত্র।
Sundarbans Tiger Widows: স্বামী হারানোর পর বদলে যায় জীবন
সুন্দরবনে মাছ, কাঁকড়া বা মধু সংগ্রহ করতে গিয়ে বাঘের হামলায় মৃত্যুর ঘটনা নতুন নয়। ২০১৬ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে শুধু বাঘের হামলায় সুন্দরবনে ৬৭ জনের মৃত্যু হয়েছিল বলে জানা যায়। বাস্তবে সংখ্যাটি আরও বেশি হতে পারে, কারণ সব ঘটনা সরকারি নথিতে আসে না।
স্বামীকে হারানোর পর এই মহিলাদের জীবনে একসঙ্গে নেমে আসে অনেকগুলি সমস্যা। একদিকে প্রিয়জনকে হারানোর শোক, অন্যদিকে সংসার চালানোর দায়িত্ব। আচমকাই বন্ধ হয়ে যায় পরিবারের নিয়মিত আয়। এর সঙ্গে জোটে সামাজিক অবহেলাও। অভিযোগ, কয়েকজন মহিলাকে স্বামী বাঘের হামলায় মারা যাওয়ার পর ‘স্বামীখেকো’ বলেও দাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। নিজের পরিবার বা আত্মীয়দের কাছ থেকেও তাঁরা পান অবহেলা ও অপমান। সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দিতে অনেককে একাই লড়াই করতে হয়েছে। তবে এত লাঞ্ছনার পরেও জঙ্গলকে তাঁরা ভোলেননি। (Sundarbans Tiger Widows)
যে জঙ্গল কেড়েছে স্বামী, তাকেই কেন বাঁচাচ্ছেন?
এই প্রশ্নের উত্তর সকলের বোঝা সম্ভব নয়। যাঁরা সুন্দরবনের বাসিন্দা তাঁরা জানেন সেখানে মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে ম্যানগ্রোভের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। ঝড়খালির ওই মহিলারাও জানেন জঙ্গল শুধু বিপদের জায়গা নয়। এই ম্যানগ্রোভ বনই উপকূলের গ্রামগুলিকে ঘূর্ণিঝড়, প্রবল ঢেউ ও জলোচ্ছ্বাসের ধাক্কা থেকে অনেকটাই রক্ষা করে। একইসঙ্গে মাছ-সহ নানা প্রাণীর আশ্রয়স্থল এই বন। ফলে মাছ ও কাঁকড়া সংগ্রহের উপর নির্ভরশীল মানুষের জীবিকার সঙ্গেও এর সরাসরি যোগ রয়েছে।
ম্যানগ্রোভ সুন্দরবনের রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের আবাসস্থলেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অর্থাৎ মানুষ, জঙ্গল ও বন্যপ্রাণী একই পরিবেশের মধ্যে বেঁচে রয়েছে। এই সম্পর্ক যেমন মানুষকে জীবিকা দেয়, তেমনই বন্যপ্রাণীর সঙ্গে সংঘাত কখনও ভয়াবহ ক্ষতিও ডেকে আনে। তবু তাঁরা জঙ্গল ধ্বংস হতে দিতে চান না।
এশিয়ান গেমসের আগেই বড় ধাক্কা ভারতের, ছিটকে গেলেন হর্ষিত রানা
এক লক্ষ চারা আর নতুন ভবিষ্যতের স্বপ্ন
নিজেদের অভিজ্ঞতা থেকে এই মহিলারা জানেন, মানুষ ও বন্যপ্রাণীর সংঘাত একটি পরিবারকে কতটা গভীর ক্ষতির মুখে ঠেলে দিতে পারে। তবু তাঁরা জঙ্গল ধ্বংসের পথ বেছে নেননি। বরং প্রায় ১০০ হেক্টর ক্ষতিগ্রস্ত বনাঞ্চলকে ফের সবুজ করে তুলতে এক লক্ষ ম্যানগ্রোভের চারা লাগানোর উদ্যোগ নিয়েছেন।
প্রতিটি চারা তাঁদের কাছে শুধু একটি গাছ নয়, সুন্দরবনের ভবিষ্যৎকে আরও নিরাপদ করার একটি পদক্ষেপ। এমন বন গড়ে তোলাই তাঁদের লক্ষ্য, যা গ্রামকে ঝড়-জলোচ্ছ্বাস থেকে রক্ষা করবে, মানুষের জীবিকা বজায় রাখবে এবং বন্যপ্রাণীদের আশ্রয় দেবে। (Sundarbans Tiger Widows)
সুন্দরবনের এই মহিলাদের গল্প তাই শুধু গাছ লাগানোর গল্প নয়, ঘুরে দাঁড়ানোর গল্পও। যে বন তাঁদের পরিবারে অপূরণীয় ক্ষতি তৈরি করেছে, সেই বনকেই তাঁরা নতুন করে গড়ে তুলতে চাইছেন। এক লক্ষ চারা হয়তো সুন্দরবনের সব সমস্যা মেটাবে না, কিন্তু প্রতিটি চারা মানুষ ও বন্যপ্রাণীর আরও নিরাপদ সহাবস্থানের সম্ভাবনা তৈরি করবে। আর হয়তো একদিন এমন সমাজও তৈরি হবে, যেখানে স্বামী হারানোর পর কোনও মহিলাকে ‘টাইগার উইডো’ পরিচয় বয়ে বেড়াতে হবে না।











