ভারতের গ্রীষ্ম মানেই আমের গন্ধে ভরে ওঠা বাজার। মালদার ফজলি থেকে রত্নাগিরির আলফানসো, গুজরাটের কেশর থেকে অন্ধ্রপ্রদেশের বাঙ্গানাপল্লি— প্রতিটি আম যেন একেকটি অঞ্চলের পরিচয় বহন করে। (Indian Mangoes) বহু বছর ধরে এই ভারতীয় আম শুধু দেশের মানুষের রসনাই তৃপ্ত করেনি, পৌঁছে গিয়েছে বিদেশের বিলাসবহুল সুপারমার্কেটেও। জাপানের মতো অত্যন্ত কড়া মান নিয়ন্ত্রণের দেশেও (Indian Mangoes) ভারতীয় আম ছিল এক বিশেষ আকর্ষণ। কিন্তু সেই সম্পর্কেই এবার বড় ধাক্কা। প্রায় ২০ বছর পর ফের ভারতীয় আমের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করল জাপান। আর এই সিদ্ধান্ত ঘিরেই উঠছে একাধিক প্রশ্ন— এটা কি শুধুমাত্র নিয়মভঙ্গের অজুহাত নয়, নাকি এর পিছনে রয়েছে বাণিজ্যিক কূটনীতি ও বাজার দখলের লড়াই?
ভারতীয় আমের আন্তর্জাতিক বাজারে সুনাম নতুন নয়। (Indian Mangoes) আলফানসো, কেশর, ল্যাংড়া কিংবা বাঙ্গানাপল্লির মতো প্রজাতির আম বহু বছর ধরে ইউরোপ, আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্যের পাশাপাশি জাপানেও রপ্তানি হয়ে আসছে। কিন্তু চলতি মরশুমে আচমকাই সেই পথে বড় বাধা তৈরি করল জাপান। ভারত থেকে আম আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে টোকিও।
জাপানের এই সিদ্ধান্তে হতাশ ভারতীয় রপ্তানিকারকরা। তাঁদের অভিযোগ, শুধুমাত্র নিয়মভঙ্গের ত্রুটি নয়, বরং বাজারে একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ কায়েম করার চেষ্টা করছে জাপান। ফলে প্রশ্ন উঠছে— ভারতীয় আম কি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নতুন কূটনৈতিক সংঘর্ষের শিকার?
কী কারণে নিষেধাজ্ঞা?
প্রতি বছর আমের মরশুম শুরুর আগে জাপান তাদের কোয়ারেন্টাইন বিশেষজ্ঞদের ভারতে পাঠায়। তাঁরা এখানে Vapour Heat Treatment বা VHT প্রক্রিয়া খতিয়ে দেখেন। এই বিশেষ পদ্ধতিতে উচ্চ তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার মাধ্যমে আমকে কীটপতঙ্গমুক্ত করা হয়, যাতে ফলের ভিতরে কোনও পোকা বা রোগজীবাণু না থাকে।
চলতি বছরের মার্চ মাসে উত্তরপ্রদেশের রহমানপুরে জাপানি পরিদর্শক দল ভারতীয় ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টগুলিতে কিছু ‘ত্রুটি’ খুঁজে পায়। অভিযোগ, জীবাণুমুক্তকরণ ও ফিউমিগেশন সংক্রান্ত নিয়ম যথাযথভাবে মানা হয়নি। এরপরই জাপানের ইয়াকোহামা প্ল্যান্ট প্রোটেকশন অ্যাসোসিয়েশন ঘোষণা করে, ২৫ মার্চের পর ভারত থেকে ইস্যু হওয়া সার্টিফিকেটযুক্ত কোনও আম আর গ্রহণ করা হবে না। সংস্থাটি জানায়, ট্রিটমেন্ট ও অপারেশনাল মানোন্নয়ন না হওয়া পর্যন্ত ভারতীয় আম আমদানি বন্ধই থাকবে।
আরও পড়ুন: শোকস্তব্ধ ভারতীয় ক্রীড়াজগৎ, প্রয়াত কিংবদন্তি কোচ মুরারি শুরআরও শক্তি বাড়ছে ভারতের?
১৯৮৬ সালের ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি
এটাই প্রথম নয়। এর আগেও ১৯৮৬ সালে (Indian Mangoes) ভারতীয় আমে ফলমাছির সংক্রমণের অভিযোগ তুলে আমদানি বন্ধ করেছিল জাপান। দীর্ঘ ২০ বছর নিষেধাজ্ঞা চলার পর ২০০৬ সালে ফের ভারতীয় আমের জন্য বাজার খুলে দেয় তারা। তারপর ভারত সরকার জাপানের মান বজায় রাখতে একাধিক VHT প্ল্যান্ট তৈরি করে। ২০০৭ সালে তিরুপতিতে প্রথম বড় প্ল্যান্ট চালু হয়। এরপর ধাপে ধাপে আরও কয়েকটি আধুনিক কেন্দ্র গড়ে ওঠে। সেই ব্যবস্থার মাধ্যমেই গত দুই দশক ধরে নিয়ম মেনে জাপানে আম রপ্তানি হচ্ছিল। কিন্তু এবার আবার সেই পুরনো দুঃস্বপ্ন ফিরে এল।

রপ্তানিকারকদের অভিযোগ
উত্তরপ্রদেশের রপ্তানিকারক আক্রম বেগের অভিযোগ, “এটি শুধুমাত্র প্রযুক্তিগত সমস্যা নয়। জাপান একটি নতুন ট্রিটমেন্ট সিস্টেম চাপিয়ে দিতে চাইছে। যদি শুধুমাত্র জাপানি প্রযুক্তিকেই অনুমোদন দেওয়া হয়, তাহলে সেটি ব্যবসায়িক একচেটিয়া আধিপত্যের ইঙ্গিত দেয়।” তিনি আরও বলেন, “সব প্ল্যান্টের আম একসঙ্গে কীভাবে বাতিল হতে পারে? মনে হচ্ছে, পরিদর্শক দল আগে থেকেই ব্যর্থ ঘোষণা করার মানসিকতা নিয়ে এসেছিল।”
রপ্তানিকারকদের একাংশের দাবি, জাপান চায় (Indian Mangoes) ভারতীয় আমের গুণমান যাচাই ও ট্রিটমেন্ট ব্যবস্থার উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রাখতে। এর ফলে ভারতীয় সংস্থাগুলির স্বাধীনতা কমবে এবং ভবিষ্যতে খরচও বাড়বে।
আরও পড়ুন: SIR প্রক্রিয়াকে বৈধতা দিল সুপ্রিম কোর্ট, নির্বাচন কমিশনের বড় স্বস্তি
ভারতীয় বাজারে কী প্রভাব পড়বে?
জাপান ভারতীয় আমের সবচেয়ে বড় ক্রেতা নয়। সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, আমেরিকা, ব্রিটেন বা ইউরোপীয় দেশগুলির তুলনায় জাপানে রপ্তানির পরিমাণ কম। তবু এই বাজারের গুরুত্ব আলাদা। কারণ, জাপানে রপ্তানি মানেই উচ্চমানের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। জাপানের মতো কঠোর মান নিয়ন্ত্রণের দেশে কোনও পণ্য ঢুকতে পারা আন্তর্জাতিক বাজারে ব্র্যান্ড ভ্যালু বাড়ায়। ফলে জাপানের নিষেধাজ্ঞা অন্য দেশগুলির মধ্যেও সন্দেহ তৈরি করতে পারে। এছাড়া চলতি বছরে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারেও আম ব্যবসা খুব লাভজনক নয়। অতিরিক্ত উৎপাদন, আবহাওয়ার অনিশ্চয়তা এবং পরিবহণ ব্যয়ের কারণে অনেক ব্যবসায়ী ক্ষতির মুখে। সেই অবস্থায় রপ্তানি বন্ধ হওয়ায় অতিরিক্ত চাপ তৈরি হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রপ্তানি কমে গেলে দেশের বাজারে আমের সরবরাহ আরও বেড়ে যাবে। এতে পাইকারি দাম কমতে পারে। প্রথমদিকে সাধারণ ক্রেতারা কম দামে আম পেলেও শেষ পর্যন্ত ক্ষতির মুখে পড়বেন কৃষকরা।

কৃষকদের উপর কী প্রভাব?
সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসবে আমচাষিদের উপর। বিশেষ করে যেসব কৃষক রপ্তানিযোগ্য মানের আম উৎপাদনে অতিরিক্ত খরচ করেন, তাঁদের ক্ষতি বেশি হবে। রপ্তানির জন্য আম চাষে আলাদা যত্ন নিতে হয়— কীটনাশক নিয়ন্ত্রণ, বিশেষ প্যাকেজিং, গ্রেডিং, ঠান্ডা সংরক্ষণ সবকিছুর খরচ অনেক বেশি। জাপানের মতো বাজারে পাঠানোর জন্য কৃষকরা আগাম বিনিয়োগও করেন। রপ্তানি বন্ধ হয়ে গেলে সেই আম দেশীয় বাজারেই বিক্রি করতে হবে কম দামে। এতে লাভ তো দূরের কথা, উৎপাদন খরচ তোলাই কঠিন হয়ে দাঁড়াবে।
মহারাষ্ট্র, গুজরাট, উত্তরপ্রদেশ ও অন্ধ্রপ্রদেশের বহু কৃষক ইতিমধ্যেই উদ্বেগে রয়েছেন। বিশেষ করে আলফানসো ও কেশর চাষিরা সবচেয়ে বেশি চিন্তিত। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি ভারতের জন্য বড় সতর্কবার্তা। শুধু উৎপাদন নয়, আন্তর্জাতিক মান নিয়ন্ত্রণ ও ট্রেসেবিলিটি আরও শক্তিশালী করতে হবে।
ভারত সরকার যদি দ্রুত জাপানের আপত্তিগুলি সমাধান করতে পারে, তাহলে আগামী মরশুমে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে তাতে সময় লাগতে পারে। অন্যদিকে, ভারত নতুন বাজারের দিকেও নজর বাড়াতে পারে। মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও ইউরোপে ভারতীয় আমের চাহিদা বাড়ছে। সেই বাজারে আরও আক্রমণাত্মকভাবে প্রবেশ করার চেষ্টা হতে পারে।
আরও পড়ুন: ইবোলা আতঙ্কে কড়া নজরদারি বেঙ্গালুরুতে, উগান্ডার তরুণী আইসোলেশনে
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট— এই ঘটনা শুধু আম রপ্তানির সমস্যা নয়। এটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বিশ্বাস, প্রযুক্তি, মান নিয়ন্ত্রণ ও কূটনীতির জটিল সমীকরণেরও প্রতিফলন। (Indian Mangoes) ভারতের আম বিশ্ব জুড়ে এখনও জনপ্রিয়। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে সেই মিষ্টি স্বাদ ধরে রাখতে গেলে এখন আরও কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়তে হবে ভারতীয় কৃষক ও রপ্তানিকারকদের।













3 thoughts on “২০ বছর পর ফের নিষেধাজ্ঞা, ভারতীয় আমে ‘না’ জাপানের, আশঙ্কায় কৃষকরা”