গত এক মাসে দেশের বাজারে চিনির দাম বেশ খানিকটা বেড়েছে। ২০ জুলাই যেখানে এক কেজি চিনির গড় দাম ছিল ৪৮.১৮ টাকা, ২০ অগস্ট তা বেড়ে হয়েছে ৫৫.৭০ টাকা। অর্থাৎ মাত্র এক মাসে দাম বেড়েছে প্রায় ১৬ শতাংশ। স্বাভাবিকভাবেই মধ্যবিত্তের পকেটে পড়েছে চাপ। প্রশ্ন উঠছে, E20 পেট্রোল তৈরিতে ইথানলের ব্যবহারই কি চিনির দাম বাড়ার মূল কারণ?
বিষয়টি একটু খতিয়ে দেখলে অবশ্য বোঝা যায়, শুধু ইথানলকে দায়ী করলে পুরো ছবিটা ধরা পড়বে না। এর পিছনে রয়েছে আরও বেশ কয়েকটি কারণ।
Sugar Price Hike: ইথানলের জন্য কি বাজারে চিনি কমে যাচ্ছে?
২০২৫-২৬ মরশুমে শিল্পমহলের হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ৩০ লক্ষ টন চিনি-সমতুল্য উৎপাদন ইথানল তৈরির কাজে চলে গিয়েছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে ৩০ লক্ষ টন আখের জমি চিনি উৎপাদন থেকে সরিয়ে ইথানলের জন্য ব্যবহার করা হয়েছে। কৃষক আলাদা করে চিনি বা ইথানলের জন্য আখ চাষ করেন না। একই আখ থেকেই কারখানায় চিনি বা ইথানল তৈরি করা যায়।তবে আখের রস, সিরাপ বা মোলাসেস ইথানল তৈরিতে ব্যবহার হলে মানুষের খাওয়ার জন্য চিনি তৈরির পরিমাণ কিছুটা কমে যায়। তাই ইথানলের প্রভাব একেবারেই নেই, এমনটাও বলা যাবে না।
কমেছে চিনির উৎপাদন
চিনির দাম বাড়ার পিছনে সবচেয়ে বড় কারণগুলির একটি হলো উৎপাদন কমে যাওয়া। কেন্দ্রের ২১ অগস্টের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে প্রায় ৩০৬ লক্ষ মেট্রিক টন চিনি উৎপাদন হতে পারে। অথচ প্রথমে প্রায় ৩৪৩ লক্ষ মেট্রিক টন উৎপাদনের আশা করা হয়েছিল। অর্থাৎ ঘাটতি প্রায় ৩৭ লক্ষ মেট্রিক টন।
অতিরিক্ত বৃষ্টিতে অনেক জায়গায় আখের জমিতে জল জমে ফসলের ক্ষতি হয়েছে। ফলে চিনি তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় আখের জোগানও কমেছে।
উৎসবের মরশুমে বাড়ছে চাহিদা
এদিকে সামনে উৎসবের মরশুম। আর উৎসব মানেই মিষ্টি, গুড় ও চিনির বাড়তি চাহিদা। বাজারে সরবরাহ যখন এমনিতেই কম, তখন চাহিদা সামান্য বাড়লেও দাম দ্রুত বেড়ে যেতে পারে।
আন্তর্জাতিক বাজার ও মজুতদারিও কারণ
শুধু দেশের পরিস্থিতি নয়, আন্তর্জাতিক বাজারেও চিনির দাম বেড়েছে এবং সরবরাহ কিছুটা কমেছে। এর প্রভাব ভারতের বাজারেও পড়ছে। পরিস্থিতি সামলাতে কেন্দ্র বহু বছর পর ১০ লক্ষ টন শুল্কমুক্ত কাঁচা চিনি আমদানির অনুমতি দিয়েছে। (Sugar Price Hike)
এর পাশাপাশি ব্যবসায়ী বা বড় ক্রেতাদের মধ্যে দাম আরও বাড়ার আশঙ্কায় চিনি মজুত করে রাখার প্রবণতাও তৈরি হতে হচ্ছে। এতে বাজারে সরবরাহ আরও কমে গিয়ে দাম বাড়ার চাপ তৈরি হচ্ছে।
কেন বাড়ছে চিনির দাম? ‘অ্যাকশন’ মুডে রাজ্যের বাজারে হানা সরকারের
ইথানলের সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছে ভুট্টাও
ইথানল তৈরিতে ভুট্টার ব্যবহারও এখন বেড়েছে। কিন্তু ভুট্টা পোলট্রি শিল্পেরও গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল। মুরগির খাবারের প্রায় ৫৫ শতাংশই ভুট্টা দিয়ে তৈরি হয়। ফলে ইথানলের চাহিদায় ভুট্টার দাম বাড়লে পোলট্রি ফিডের খরচও বাড়তে পারে। তার প্রভাব পড়তে পারে ডিম ও মুরগির দামেও।
তাহলে E20 কতটা দায়ী?
E20 হলো এমন পেট্রোল, যাতে ২০ শতাংশ ইথানল মেশানো থাকে। ইথানল তৈরিতে চিনি, ভুট্টার মতো কাঁচামাল ব্যবহার হয়। তাই অনেকের ধারণা, E20-র চাহিদা বাড়ায় ইথানল তৈরিতে বেশি কাঁচামাল চলে যাচ্ছে এবং তার ফলেই সাধারণ মানুষের চিনির দাম বাড়ছে।
কথাটা পুরোপুরি ভুল নয়, কিন্তু এটিই একমাত্র কারণও নয়। চিনির উৎপাদন কমে যাওয়া, অতিরিক্ত বৃষ্টিতে আখের ক্ষতি, উৎসবের সময়ে চাহিদা বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়া এবং মজুত করে রাখার প্রবণতা—সব মিলিয়েই বর্তমান পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। (Sugar Price Hike)
অর্থাৎ চিনির দাম বাড়ার জন্য শুধু E20 বা ইথানলকে দায়ী করা ঠিক হবে না। ইথানল অবশ্যই এই সমীকরণের একটি অংশ, কিন্তু নেপথ্যে রয়েছে আরও বেশ কয়েকটি বড় কারণ।











