সপ্তাহে সোমবার থেকে শনিবার টানা কাজের পর ক্যালেন্ডারে রবিবারটা দেখলেই যেন একটু স্বস্তি আসে। স্কুল, কলেজ, অফিস, সরকারি দফতর—বেশিরভাগ জায়গাতেই রবিবার মানেই ছুটির দিন। কিন্তু কখনও কি ভেবে দেখেছেন, সপ্তাহের সাতটি দিনের মধ্যে রবিবারকেই কেন ছুটির জন্য বেছে নেওয়া হলো? এর পিছনে কিন্তু শুধু ধর্মীয় কারণ নয়, রয়েছে শ্রমিকদের দীর্ঘ আন্দোলনের ইতিহাসও।
আজ যে রবিবারে ছুটি পাওয়া আমাদের কাছে একেবারে স্বাভাবিক ব্যাপার, একসময় কিন্তু ভারতীয় শ্রমিকদের জন্য এমন কোনও সাপ্তাহিক ছুটিই ছিল না। ব্রিটিশ আমলে বিভিন্ন কলকারখানা ও বিশেষ করে বস্ত্রকলের শ্রমিকদের সপ্তাহের সাত দিনই কাজ করতে হত। কাজের সময়ও ছিল দীর্ঘ। অন্যদিকে ব্রিটিশ কর্মকর্তা ও ইউরোপীয়দের মধ্যে রবিবারে গির্জায় যাওয়ার রীতি ছিল। ফলে তাঁদের জীবনে রবিবারের আলাদা গুরুত্ব থাকলেও ভারতীয় শ্রমিকদের জন্য সেই দিনটি ছিল আর পাঁচটা দিনের মতোই।
Sunday Day Off: শুরুটা হলো শ্রমিকদের দাবি দিয়েই
এই পরিস্থিতির বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলেন শ্রমিক নেতা নারায়ণ মেঘাজি লোখণ্ডে। তাঁর দাবি ছিল, একজন শ্রমিকও তো মানুষ। তাঁকেও সপ্তাহে অন্তত একটা দিন বিশ্রামের সুযোগ দিতে হবে। ছয় দিন কাজের পর এক দিন ছুটি থাকা উচিত।
লোখণ্ডে শুধু রবিবারের ছুটির দাবিই তোলেননি। শ্রমিকদের দুপুরে খাবার ও বিশ্রামের জন্য সময় দেওয়া, নির্দিষ্ট কাজের সময় এবং কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় শ্রমিকের সুরক্ষার মতো একাধিক দাবিও সামনে এনেছিলেন। ১৮৮০-র দশকে তাঁর নেতৃত্বে শ্রমিকদের মধ্যে এই দাবিগুলি নিয়ে সংগঠন ও আন্দোলন জোরদার হতে থাকে। ১৮৮৪ সালে হাজার হাজার শ্রমিকের সমর্থন নিয়ে সাপ্তাহিক ছুটির দাবিও সামনে আসে।
অনুব্রতর সামনেই সিউড়ির তৃণমূল অফিসে হামলা, আটক ৩
তবে দাবি উঠলেই তা মেনে নেওয়া হয়নি। লোখণ্ডে এবং শ্রমিকদের দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন চালাতে হয়। ১৮৯০ সালের ২৪ এপ্রিল মুম্বইয়ের মহালক্ষ্মী রেসকোর্সে প্রায় ১০ হাজার শ্রমিকের একটি বড় সমাবেশও হয়েছিল। সেখানে রবিবার সাপ্তাহিক ছুটির দাবিতে শ্রমিকদের ঐক্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
অবশেষে এল সেই দিন
দীর্ঘ টানাপোড়েনের পর ১৮৯০ সালের ১০ জুন রবিবারকে সাপ্তাহিক ছুটির দিন হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত আসে। এরপর ধীরে ধীরে এই ব্যবস্থা আরও বিস্তৃত হয়। অর্থাৎ আজকের রবিবারের ছুটির পিছনে শুধু প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, রয়েছে শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের লড়াইও।
কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়—রবিবারই কেন?
এর একটা বড় কারণ ব্রিটিশদের ধর্মীয় রীতি। খ্রিস্টানদের কাছে রবিবার ছিল প্রার্থনা ও গির্জায় যাওয়ার দিন। ব্রিটিশ শাসনের সময় সেই রীতির প্রভাবেই রবিবারকে বিশ্রামের দিন হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। তবে ভারতীয় শ্রমিকদের আন্দোলনে রবিবারের ছুটির দাবি শুধু ব্রিটিশদের রীতি অনুসরণ করার বিষয় ছিল না; মূল দাবি ছিল সপ্তাহে অন্তত একটি দিন শ্রমিকদের বিশ্রামের অধিকার নিশ্চিত করা। (Sunday Day Off)
আর এই কারণেই আজকের ছুটির দিন রবিবারের সঙ্গে জড়িয়ে আছে নারায়ণ মেঘাজি লোখণ্ডের নাম। ইতিহাসের এই অধ্যায় মনে করিয়ে দেয়, যে ছুটিটাকে আমরা আজ জীবনের স্বাভাবিক অংশ বলে ধরে নিই, সেটাও একসময় ছিল শ্রমিকদের লড়াই করে অর্জন করা অধিকার।













3 thoughts on “সারা সপ্তাহ কাজের পর রবিবারই কেন ছুটি? জানেন কি কারণটা?”
Comments are closed.