আজ ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের ফাইনালে মুখোমুখি হতে চলেছে দুই ফুটবল শক্তি—আর্জেন্টিনা ও স্পেন। একদিকে লাতিন আমেরিকার ঐতিহ্যবাহী শক্তি আর্জেন্তিনা, অন্যদিকে ইউরোপীয় ফুটবলের অন্যতম সেরা দল স্পেন। এই মহারণের আগে ফুটবলপ্রেমীদের মনে একটাই প্রশ্ন—শেষ হাসি হাসবে কে? তবে যেই হাসি হাসুক না কেন ফিফা বিশ্বকাপ ট্রফি তুলে দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আপনি কি জানেন, এই এই ট্রফিটির ডিজাইন কে তৈরি করেছিলেন?
মিলানের ব্রেরা এলাকার নিজের স্টুডিয়োতেই বিশ্বকাপ ট্রফির নকশা তৈরি করেছিলেন ইতালীয় ভাস্কর সিলভিও গাজ্জানিগা। ট্রফিটিতে দুজন মানবমূর্তিকে পৃথিবীকে দুই হাত দিয়ে উঁচিয়ে ধরে রাখতে দেখা যায়। এটি মূলত ক্রীড়াবিদদের সংগ্রাম, ভক্তদের উল্লাস এবং বিজয়ের মুহূর্তকে নির্দেশ করে (FIFA world cup trophy)।
কীভাবে তৈরি হয়েছিল FIFA বিশ্বকাপ ট্রফির নকশা?
সিলভিও গাজ্জানিগা ১৯২১ সালে ইতালির মিলানে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন একজন প্রখ্যাত ভাস্কর ও পদক নকশাকার। ১৯৭০ সালে ব্রাজিল জুলে রিমে কাপ স্থায়ীভাবে জিতে নেওয়ার পর, FIFA ১৯৭৪ সালের বিশ্বকাপের জন্য একটি নতুন ট্রফি তৈরির সিদ্ধান্ত নেয়। ১৯৭১ সালে ফিফা নতুন ট্রফির নকশার জন্য বিশ্বজুড়ে প্রতিযোগিতার আয়োজন করে। বিশ্বের ৭টি দেশের ভাস্করদের কাছ থেকে মোট ৫৩টি নকশা জমা পড়ে। এর মধ্যে ইতালির মিলান শহরের বিখ্যাত ভাস্কর সিলভিও গাজ্জানিগা (Silvio Gazzaniga)-র নকশাটি FIFA নির্বাচন করে। ইতালির মিলান শহরের বিখ্যাত ট্রফি ও মেডেল প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান জিডিই বার্টোনি (GDE Bertoni) ভাস্কর সিলভিও গাজ্জানিগার ডিজাইন দেখে এই ট্রফিটি তৈরি করে। এখনও পর্যন্ত এই ট্রফিটির রক্ষণাবেক্ষণ এবং রেপ্লিকা তৈরির কাজ তারাই করে।
ট্রফির নকশা নিয়ে কী বলেছিলেন, গাজ্জানিগা?
ভাস্কর গাজ্জানিগা এই ট্রফির নকশা নিয়ে বলেছিলেন, “মানবমূর্তি সর্পিলভাবে উঠে ছড়িয়ে গিয়ে গোটা পৃথিবীকে জড়িয়ে ধরেছে। এই গতিশীল ভাস্কর্যটি মূলত একজন ক্রীড়াবিদের বিজয়ের চরম মুহূর্তের আবেগ এবং উল্লাসকে ফুটিয়ে তোলে।” এতে দুজন মানবমূর্তি গোটা পৃথিবীকে হাত দিয়ে উঁচিয়ে ধরে রেখেছে (FIFA world cup trophy)।
FIFA-ট্রফির বৈশিষ্ট্য কী?
ট্রফিটি ৩৬.৮ সেন্টিমিটার (১৪.৫ ইঞ্চি) উঁচু। এর ওজন প্রায় ৬.১৭৫ কেজি। এটি সম্পূর্ণ ১৮ ক্যারেট (৭৫%) নিরেট সোনা দিয়ে তৈরি। এর নিচের অংশে সবুজ রংয়ের দামী মালাকাইট (Malachite) পাথরের দুটি স্তর রয়েছে। ট্রফির নিচের দিকে একটি গোল প্লেট রয়েছে, যেখানে ১৯৭৪ সাল থেকে শুরু করে প্রতিটি বিশ্বকাপে বিজয়ী দেশগুলির নাম তাদের নিজস্ব ভাষায় খোদাই করা হয়। ২০৩৮ সালের বিশ্বকাপ পর্যন্ত এই ট্রফিতে নাম লেখার জায়গা রয়েছে।
‘জুলে রিমে ট্রফি’র বৈশিষ্ট্য কী?
১৯৩০ সালে অনুষ্ঠিত প্রথম বিশ্বকাপের জন্য ট্রফিটি প্রবর্তন করা হয়েছিল। এতে গ্রিক বিজয়ের দেবী ‘নাইকি’-র (Nike) অবয়ব ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল এবং পরবর্তীতে এই প্রতিযোগিতার প্রতিষ্ঠাতা ফিফা (FIFA) সভাপতির নামানুসারে এটি ‘জুলে রিমে ট্রফি’ নামে পরিচিতি লাভ করে। ফরাসি ভাস্কর আবেল লাফ্লুর (Abel Lafleur)-এর নকশা করা এই ট্রফিটি ছিল স্বর্ণের প্রলেপযুক্ত স্টার্লিং সিলভারের তৈরি এবং এর ভিত্তিটি ছিল ল্যাপিস লাজুলি পাথরের।
ট্রফি চুরির রোমাঞ্চকর ইতিহাস ও নিয়ম বদল
ফিফার ট্রফিকে কেন্দ্র করে ফুটবলের ইতিহাসে বেশ কিছু নাটকীয় ঘটনা ঘটেছে।
১. ফিফার আগের নিয়ম ছিল, যে দেশ তিনবার বিশ্বকাপ জিতবে, তারা মূল ট্রফিটি চিরতরে নিজেদের দেশে রেখে দিতে পারবে। ১৯৬৮ সালে ব্রাজিল ফুটবল দল (১৯৫৮, ১৯৬২ ও ১৯৭০ সালে) তিনবার বিশ্বকাপ জিতে জুল রিমে ট্রফিটি স্থায়ীভাবে নিজেদের দেশে নিয়ে যায়। এরপর থেকেই ফিফা নিয়ম পরিবর্তন করা হয়। সেখানে বলা হয় আসল ট্রফি আর কাউকে চিরতরে দেওয়া হবে না।
২. ১৯৬৬ সালের ইংল্যান্ড বিশ্বকাপের চার মাস আগে লন্ডনে একটি প্রদর্শনী থেকে জুলে রিমে ট্রফিটি চুরি হয়ে যায়। চুরির কিছুদিন পর ‘পিকলস’ (Pickles) নামের একটি পোষা কুকুর লন্ডনের একটি বাগানের ঝোপের ভেতর থেকে খবরের কাগজে মোড়ানো অবস্থায় ট্রফিটি অক্ষত খুঁজে বের করে।
৩. ১৯৮৩ সালে ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরোতে ফুটবল ফেডারেশনের সদর দফতর থেকে কাচ ভেঙে জুল রিমে ট্রফিটি আবারও চুরি হয়। মূল ট্রফিটি আর কখনোই উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। পরবর্তীতে বার্টোনি কোম্পানি ব্রাজিলের জন্য এই ট্রফির একটি হুবহু রেপ্লিকা তৈরি করে দেয়।
নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে ফিফা এখন আর কোনও বিজয়ী দেশকে আসল ট্রফিটি নিজেদের দেশে নিয়ে যেতে দেয় না। ফাইনাল ম্যাচের পর মূল ট্রফিতে বিজয়ী দলের নাম খোদাই করে সেটি সুইজারল্যান্ডের জুরিখে অবস্থিত ফিফা বিশ্ব ফুটবল মিউজিয়ামে ফেরত নিয়ে যাওয়া হয়। চ্যাম্পিয়ন দলটিকে আসল সোনার ট্রফির বদলে ব্রোঞ্জের ওপর সোনার প্রলেপ দেওয়া একটি হুবহু অফিসিয়াল রেপ্লিকা (Replica) দেওয়া হয়, যা তারা স্থায়ীভাবে নিজেদের কাছে রাখতে পারে।
ফাইনালের আগে আবেগঘন বার্তায় বিদায়ের ইঙ্গিত জোরালো, কী লিখলেন মেসি?










