গাছের পাতায় অচেনা দাগ, কাণ্ডে ছত্রাক কিংবা হঠাৎ পোকার আক্রমণ- চাষির কাছে এমন সমস্যা মানেই দুশ্চিন্তা। গাছের কী রোগ হয়েছে, কোন ওষুধ দিতে হবে, কতটা দিতে হবে এগুলি ঠিক করে না জানলে, একটি ভুল সিদ্ধান্তেই নষ্ট হতে পারে গোটা ফসল। কিন্তু এবার আর চিন্তা নেই। এই ধরনের সমস্যায় হাতের মুঠোয় থাকা স্মার্টফোনই হয়ে উঠছে কৃষকের সহায়। আক্রান্ত গাছের ছবি তুলে একটি অ্যাপে পাঠালেই মিলছে সম্ভাব্য রোগের হদিশ, ওষুধের পরামর্শ থেকে শুরু করে আবহাওয়া অনুযায়ী চাষের সিদ্ধান্তও। কিন্তু কীভাবে?
অ্যাপে ছবি পাঠিয়েই রেহাই পেলেন বারাণসীর কৃষক
উত্তরপ্রদেশের বারাণসীর কৃষক শিব কুমার যাদবের অভিজ্ঞতাই অন্যতম এক উদাহরণ। চার একর জমিতে আমের চারা তৈরির নার্সারি তাঁর। হঠাৎ চারার কাণ্ডে কালো দাগ ও সাদা ছত্রাকের মতো আস্তরণ দেখা দিতে শুরু করে। একের পর এক পাতা ঝরে পড়ছিল। কী রোগ হয়েছে, তা বুঝতে স্থানীয় কীটনাশক বিক্রেতা ও অন্য কৃষকদের কাছ থেকে পরামর্শ নিয়েও নিশ্চিত হতে পারছিলেন না তিনি।
শেষ পর্যন্ত আক্রান্ত চারার ছবি তুলে FarmerChat নামে একটি অ্যাপে পাঠান শিব কুমার। অ্যাপটি আরও কিছু তথ্য নিয়ে সম্ভাব্য রোগ শনাক্ত করে এবং কীভাবে পরিস্থিতি সামলাতে হবে তা জানায়। আক্রান্ত অংশ কেটে ফেলা, জল জমতে না দেওয়া, অতিরিক্ত সেচ বন্ধ করা এবং নির্দিষ্ট মাত্রায় ছত্রাকনাশক ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়। কয়েক দিনের মধ্যেই রোগ নিয়ন্ত্রণে আসে। শিব কুমারের দাবি, এতে বহু চারা বাঁচানোর পাশাপাশি প্রায় ১০ হাজার টাকার ক্ষতি ও অতিরিক্ত খরচ এড়ানো সম্ভব হয়েছে।
শুধু রোগ শনাক্ত নয়, কখন কী করবেন তাও জানাচ্ছে অ্যাপ
FarmerChat-এর কাজ শুধু গাছের রোগ চেনানো নয়। কখন সার দিতে হবে, কখন সেচ প্রয়োজন, কখন বীজ বোনা উচিত—এমন প্রশ্নেও পরামর্শ দিচ্ছে এই অ্যাপ। কৃষকের জমির অবস্থান, ফসলের বয়স, আবহাওয়ার পূর্বাভাস এবং কৃষি সংক্রান্ত নির্ভরযোগ্য তথ্য মিলিয়ে উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।
বারাণসীর আর এক কৃষক বিশ্বেশ কুমার সিংয়ের গমের জমিতে হলুদ ও বাদামি দাগ দেখা দিয়েছিল। ছবি পাঠানোর পর অ্যাপটি কার্বেন্ডাজিম ও হেক্সাকোনাজল নির্দিষ্ট মাত্রায় ব্যবহারের পরামর্শ দেয়। সঙ্গে দেওয়া হয় সেচ ও জমি নজরে রাখার নির্দেশ। বিশ্বেশের দাবি, এতে বারবার কীটনাশক ব্যবহার না করে প্রায় ৮-১০ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ বাঁচাতে পেরেছেন।
বিয়ে টিকিয়ে রাখার আসল মন্ত্র কী ? শাহরুখের উত্তরে চমকে যাওয়ার মতো
আবার বিহারের কৃষক অনু কুমারীর ক্ষেত্রে অ্যাপের পরামর্শ ছিল—এখনই কিছু না করে অপেক্ষা করা। আলু বোনার আগে আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেখে তাঁকে একদিন অপেক্ষা করতে বলা হয়। পরের দিনই ভারী বৃষ্টি হয়। সময়মতো বীজ না বোনায় প্রায় ৫ হাজার টাকার ক্ষতি এড়াতে পেরেছিলেন তিনি।
১০ লক্ষের বেশি কৃষকের কাছে পৌঁছেছে AI পরিষেবা
FarmerChat তৈরি করেছে অলাভজনক সংস্থা Digital Green India। ২০০৮ সালে পথচলা শুরু করা সংস্থাটি প্রথমে স্থানীয় ভাষায় কৃষকদের জন্য প্রশিক্ষণমূলক ভিডিয়ো তৈরি করত। এখনও পর্যন্ত ১০ হাজারের বেশি কৃষি বিষয়ক ভিডিয়ো তৈরি করে প্রায় ৬৫ লক্ষ কৃষকের কাছে পৌঁছেছে তারা।
এরপর স্মার্টফোনের ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কৃষকের হাতে সরাসরি প্রয়োজনীয় তথ্য পৌঁছে দিতে ২০২৪ সালের অক্টোবরে চালু হয় FarmerChat। সংস্থার দাবি, ইতিমধ্যেই ১০ লক্ষের বেশি মানুষ এই পরিষেবা ব্যবহার করেছেন।
Digital Green India-র CEO নিধি ভাসিনের মতে, কৃষিতে সমস্যা তথ্যের অভাব নয়। আসল সমস্যা হলো সঠিক তথ্য সঠিক সময়ে এবং কৃষকের বোঝার মতো ভাষায় পৌঁছনো।
সম্প্রতি গবেষণায় দেখা গিয়েছে, সক্রিয় ব্যবহারকারীদের ৬০ শতাংশ এই অ্যাপের পরামর্শ অনুযায়ী পদক্ষেপ করেছেন। তাঁদের মধ্যে ৮৩ শতাংশ মানুষ জানিয়েছেন, কৃষি সংক্রান্ত তথ্য পাওয়া সহজ হয়েছে।
আগামী দিনে ফসলের ব্যক্তিগত ক্যালেন্ডার, সরকারি প্রকল্পের তথ্য, বাজারদর, ঋণ এবং ফসল বিক্রির সুযোগও এই ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। ফলে স্মার্টফোনের এই ছোট্ট একটি অ্যাপই হয়তো কৃষকের মাঠে সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার অন্যতম সহায়ক হয়ে উঠতে পারে।













1 thought on “গাছের ছবি তুললেই মিলছে রোগের হদিশ, কৃষকের পাশে এই ফ্রি AI অ্যাপ”
Comments are closed.