পশ্চিমবঙ্গের স্কুলশিক্ষা ব্যবস্থার একাধিক দুর্বলতা সামনে এনেছে ভারতের মহা হিসাব নিরীক্ষক (CAG)-এর সাম্প্রতিক রিপোর্ট। যা কেন্দ্রের ‘সমগ্র শিক্ষা’ প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিপন্থী বলে বলা হয়েছে। ২০১৯-২০ থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষ পর্যন্ত প্রকল্পের কার্যকারিতা খতিয়ে দেখে সিএজি জানিয়েছে, শিক্ষক সংকট, উচ্চ হারে স্কুলছুট, অপর্যাপ্ত পরিকাঠামো এবং বরাদ্দ অর্থের পূর্ণ ব্যবহার না হওয়ায় শিক্ষাক্ষেত্রে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে (CAG Report)।
CAG Report: স্কুলশিক্ষা ব্যবস্থায় দুর্বলতা
রিপোর্ট অনুযায়ী, উচ্চ প্রাথমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিক (CAG Report) স্তরে পৌঁছনোর পথে ২৮ থেকে ৪২ শতাংশ পড়ুয়া শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে বাদ পড়ছে। সমীক্ষায় অংশ নেওয়া স্কুলছুট পড়ুয়াদের মধ্যে ৫৩ শতাংশ আর্থিক অনটনকে প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে। এছাড়া ১৪ শতাংশ পড়াশোনায় অনীহা, ১৩ শতাংশ কাজের খোঁজে অন্যত্র চলে যাওয়া এবং ১২ শতাংশ অল্প বয়সে বিয়ের কারণে পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছে। সিএজির মতে, এই প্রবণতা শিক্ষার সার্বজনীনীকরণের লক্ষ্যে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
উদ্বেগজনক শিক্ষক সংকট
শিক্ষক সংকটের চিত্র আরও উদ্বেগজনক। রাজ্যের ৫২০ টি স্কুলে কোনও শিক্ষক নেই। এর ফলে প্রায় ৮,৬০০ পড়ুয়ার পড়াশোনা সরাসরি প্রভাবিত হচ্ছে। অন্যদিকে ৫,১৫২টি স্কুলে মাত্র একজন শিক্ষক দিয়ে পাঠদান চলছে, যেখানে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা ১ লক্ষ ৭৬ হাজারেরও বেশি। প্রাথমিক স্তরে ৩১,৬৮৪ এবং উচ্চ প্রাথমিক স্তরে ২,০৫৮ শিক্ষকের ঘাটতি রয়েছে। উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের ৭৯ শতাংশ স্কুলে নির্ধারিত শিক্ষক-ছাত্র অনুপাত মানা হচ্ছে না। ফলে শিক্ষার মান ও পাঠদানের গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
স্কুলের পরিকাঠামোতেও একাধিক ঘাটতির কথা উল্লেখ করেছে সিএজি। প্রাথমিক ও উচ্চ প্রাথমিক স্তরের প্রায় ১২ শতাংশ স্কুলে শ্রেণিকক্ষের তুলনায় ছাত্রসংখ্যা বেশি। মাধ্যমিক স্তরের ৩৩ শতাংশ এবং উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের ৬৬ শতাংশ স্কুলে অতিরিক্ত ভিড়ের সমস্যা রয়েছে। এর ফলে পাঠদানে বিঘ্ন ঘটছে এবং পড়ুয়াদের শেখার পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
শিক্ষকের অভাবে বন্ধ শিক্ষাকেন্দ্র
রিপোর্টে আরও বলা হয়েছে, শিক্ষক অবসর গ্রহণ বা মৃত্যুর পর নতুন নিয়োগ না হওয়ায় গত পাঁচ বছরে ২৮৪টি শিশু শিক্ষা কেন্দ্র (SSK) এবং ১০টি মাধ্যমিক শিক্ষা কেন্দ্র (MSK) বন্ধ হয়ে গেছে। ২০২৪-২৫ সালেও বাঁকুড়া ও পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার ৫২টি কেন্দ্র বন্ধ অবস্থায় রয়েছে। সিএজির আশঙ্কা, এর ফলে বহু পড়ুয়া হয় শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, নয়তো দূরের স্কুলে যেতে বাধ্য হচ্ছে।
উদ্বেগে শিক্ষার মান
শিক্ষার মানের ক্ষেত্রেও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। দশম শ্রেণির ১০ থেকে ১৩ শতাংশ এবং দ্বাদশ শ্রেণির ১২ থেকে ১৭ শতাংশ পড়ুয়া বোর্ড পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়েছে। নিরীক্ষার অংশ হিসেবে নেওয়া পৃথক মূল্যায়নে দেখা গেছে, ৩৫ শতাংশ পড়ুয়া গণিত ও বিজ্ঞানসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলিতে ৪০ শতাংশের কম নম্বর পেয়েছে। স্কুল পরিচালনা ও উন্নয়নের জন্য বাধ্যতামূলক স্কুল ম্যানেজমেন্ট কমিটিও বহু স্কুলে গঠন করা হয়নি বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।
অর্থ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও বড়সড় গাফিলতির অভিযোগ উঠেছে। ২০১৯-২৪ সময়কালে সমগ্র শিক্ষা প্রকল্পে বরাদ্দ অর্থের মাত্র ৪৬ থেকে ৬৫ শতাংশ খরচ হয়েছে। বিভিন্ন নির্মাণ প্রকল্পে বিলম্বের কারণে ৩৯৫ কোটি টাকা ফেরত দিতে হয়েছে। পাশাপাশি প্রকল্পের অধীনে ২,৪২৮ কোটি টাকার অর্থ কম পাওয়ায় বহু পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বাধা সৃষ্টি হয়েছে।
সমস্যায় বিশেষ চাহিদাসম্পন্নরা
বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের ক্ষেত্রেও একাধিক সমস্যা ধরা পড়েছে। বহু পড়ুয়া পরিবহণ সহায়তা, এসকর্ট ভাতা এবং নির্ধারিত আর্থিক অনুদান পায়নি। রাজ্যের ১৫ শতাংশ স্কুলে র্যাম্প নেই এবং ৭২ শতাংশ স্কুলে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের উপযোগী শৌচালয় নেই। বিশেষ শিক্ষকের ৯৫ শতাংশ পদ খালি রয়েছে।
সিএজির এই রিপোর্ট প্রকাশ্যে আসার পর শিক্ষামহলে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিরোধীদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষক নিয়োগ ও পরিকাঠামো উন্নয়নে অবহেলার ফলেই এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে রাজ্য সরকারের তরফে এখনও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তবে শিক্ষাবিদদের একাংশের মতে, শিক্ষক নিয়োগ, পরিকাঠামো উন্নয়ন এবং স্কুলছুট রোধে দ্রুত পদক্ষেপ না করা হলে ভবিষ্যতে শিক্ষাক্ষেত্রে আরও বড় সংকট তৈরি হতে পারে।








