যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪ নম্বর গেটের সামনে থাকা ঐতিহ্যবাহী এমব্লেমকে ঘিরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। সম্প্রতি ছাত্র সংঘর্ষের ঘটনায় ঐতিহাসিক এই প্রতীকটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পরেই সামনে এসেছে তার ইতিহাস, শিল্পমূল্য এবং গভীর তাৎপর্যের নানা দিক। অনেকেরই হয়তো জানা নেই, এই বিশেষ প্রতীকের নকশার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বাংলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিল্পী নন্দলাল বসুর নাম।
বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য বিশেষ নকশা করেছিলেন নন্দলাল বসু
১৯৫৫ সালে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সময় প্রবেশদ্বারের জন্য একটি বিশেষ প্রতীক তৈরির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল শিল্পী নন্দলাল বসুকে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্নেহধন্য এই শিল্পী তখন দেশের শিল্পজগতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নাম। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবনা, শিক্ষাদর্শ এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সঙ্গে শিল্প-সংস্কৃতির সমন্বয়ের কথা মাথায় রেখেই তিনি এই নকশা তৈরি করেছিলেন।এমব্লেমটির দিকে তাকালে প্রথমেই চোখে পড়ে একটি বৃত্তের মধ্যে থাকা তিনটি অগ্নিশিখা। তার চারপাশে বাংলা ও হিন্দি ভাষায় লেখা রয়েছে ‘যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়’। আর একেবারে বাইরের অংশজুড়ে রয়েছে পদ্মপাপড়ির বলয়। এই প্রতিটি উপাদানেরই রয়েছে আলাদা অর্থ। (Jadavpur University Logo)
বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস নিয়ে গবেষণা করা ব্যক্তিদের মতে, তিনটি অগ্নিশিখা মূলত জ্ঞান, আধ্যাত্মিক বিকাশ এবং সংস্কৃতিমনস্কতার প্রতীক। একই সঙ্গে এর মধ্যে মেধা, সৃজনশীলতা এবং কল্পনাশক্তির বিকাশের ভাবনাও রয়েছে।অন্যদিকে, পদ্মপাপড়ির বাইরের বলয় তুলে ধরে সূক্ষ্ম শিল্পবোধ, সৌন্দর্যচেতনা এবং মানবিক মূল্যবোধের ধারণা। অর্থাৎ, শুধু বিজ্ঞান বা প্রযুক্তিগত শিক্ষাই নয়, একজন শিক্ষার্থীর মধ্যে শিল্প-সংস্কৃতি, সৃজনশীলতা এবং মানবিকতারও বিকাশ ঘটানো দরকার—নন্দলাল বসুর নকশায় সেই ভাবনাই ফুটে উঠেছে।
মেদিনীপুরে মন্ত্রীর আচমকা অভিযান, ফায়ার লাইসেন্স না থাকায় মল-লজ বন্ধের নির্দেশ
‘ল্যাম্প ইন লোটাস’-এও রয়েছে প্রতীকের তাৎপর্য
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস নিয়ে লেখা ‘ল্যাম্প ইন লোটাস’ বইতেও এই এমব্লেমের তাৎপর্য বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে। ইতিহাসবিদ রামপ্রসাদ দে, আনন্দ লাল এবং অমৃতা সেন বইটিতে জানিয়েছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাদর্শের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই এই প্রতীক তৈরি করেছিলেন নন্দলাল বসু।
ফলে এটি নিছক কোনও প্রবেশদ্বারের সাজসজ্জা নয়। এর প্রতিটি অংশের মধ্যেই রয়েছে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং মানবিক মূল্যবোধের একটি নির্দিষ্ট বার্তা।
সংঘর্ষে ক্ষতিগ্রস্ত, দ্রুতই ফেরানো হলো ঐতিহ্যের প্রতীক
বৃহস্পতিবার ABVP এবং SFI সমর্থকদের সংঘর্ষের সময় ক্ষতিগ্রস্ত হয় যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ঐতিহাসিক এমব্লেম। যে লোহার বলয়ের মধ্যে প্রতীকটি বসানো ছিল, সেটি খুলে যায়। ঘটনাকে কেন্দ্র করে শুরু হয় রাজনৈতিক চাপানউতোরও। তবে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ দ্রুত ব্যবস্থা নেয়। শুক্রবার সন্ধ্যার মধ্যেই এমব্লেমটি ফের নির্দিষ্ট জায়গায় বসিয়ে দেওয়া হয়। (Jadavpur University Logo)
ঘটনার পর ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তনী, শিক্ষক এবং সাধারণ মানুষের মধ্যেও। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের এমিরেটাস অধ্যাপক সুপ্রিয় চৌধুরী-সহ একাধিক অধ্যাপক বলেন, এই এমব্লেম কোনও সাধারণ শিল্পকর্ম নয়। এর সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস ও ঐতিহ্য গভীরভাবে জড়িয়ে রয়েছে। তাই এমন একটি প্রতীকের ক্ষতি অত্যন্ত নিন্দনীয়। তাঁদের বক্তব্য, যারা এই ঘটনা ঘটিয়েছেন, তাঁরা সম্ভবত এমব্লেমটির ইতিহাস এবং গুরুত্ব সম্পর্কে যথেষ্ট সচেতন নন।









2 thoughts on “নন্দলাল বসুর আঁকা যাদবপুরের ঐতিহ্যবাহী এমব্লেম, আসল অর্থ কী জানেন?”