রাজ্য খেলার দুনিয়া দেশ মুশকিল আসান বিদেশ বিনোদন ব্যবসা ও বাণিজ্য লাইফস্টাইল ও স্বাস্থ্য টেক

---Advertisement---

নোংরা রান্নাঘর থেকে খোলা তেল, কী ভাবে মুম্বইয়ে ‘ফুড সেফটি’ অভিযান চালাচ্ছেন তুকারাম মুন্ডে?

Published on: August 26, 2026
---Advertisement---

মুম্বইয়ের খাবারের দোকানগুলিতে এবার কড়া নজরদারি। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই একের পর এক রেস্তরাঁ, খাবারের দোকান, হোটেল এবং ফুটপাতের বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করেছেন মহারাষ্ট্রের খাদ্য নিরাপত্তা কমিশনার তুকারাম মুন্ডে। মে মাসে দায়িত্ব নেওয়ার পর তাঁর দফতর এখনও পর্যন্ত ৩ হাজারের বেশি হানা দিয়েছে। বাদ যায়নি বড় খাদ্য সংস্থাও। (Mumbai Food Safety)

চারটি ডমিনোজ এবং একটি পিৎজা হাটের আউটলেটের লাইসেন্স সম্প্রতি স্থগিত করা হয়েছে। কোথাও মিলেছে নোংরা পরিবেশ, কোথাও মেয়াদ পেরিয়ে যাওয়া খাবার। আবার কোথাও দেখা গিয়েছে আরশোলা ও ইঁদুরের উপদ্রব।

‘আমি সেলিব্রিটি নই’

তাঁর এই অভিযান সাধারণ মানুষের মধ্যে যথেষ্ট সাড়া ফেলেছে। রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মুন্ডে বলেন, “আমি সেলিব্রিটি নই। আমি শুধু খাদ্য নিরাপত্তা কমিশনার।”

তাঁর বক্তব্য, খাবারের সঙ্গে মানুষের জীবন জড়িয়ে রয়েছে। তাই নিয়ম না মানলে নিয়ন্ত্রক সংস্থা যে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা, সেটাই করবে। মুন্ডের দল বড় খাদ্য সংস্থার পাশাপাশি স্থানীয় রেস্তরাঁ, রাস্তার ধারের দোকান, হোটেল এবং বহু পুরনো খাবারের প্রতিষ্ঠানেও অভিযান চালিয়েছে। (Mumbai Food Safety)

আদালতের ক্যান্টিনেও হানা

অভিযান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল আদালতেও। মুম্বইয়ের এক বিচারক জানতে চেয়েছিলেন, খাদ্য দফতর কি শুধু বেসরকারি ব্যবসার বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নিচ্ছে? আদালতের ক্যান্টিনে আদৌ পরিদর্শন হয়েছে কি না, সেই প্রশ্নও ওঠে। এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মুন্ডের দল আদালতের ক্যান্টিনে গিয়ে পরিদর্শন করে। সেখানে লাইসেন্স ছাড়া চলা কয়েকটি প্রতিষ্ঠান বন্ধও করা হয়।

ইঁদুর, আরশোলা, মেয়াদ-ফুরনো খাবার

অভিযানের পর প্রকাশ্যে আসা ছবিতে খাবারের দোকান এবং খাদ্য সংরক্ষণের জায়গার বেহাল ছবি দেখা গিয়েছে। কোথাও দেওয়ালে ময়লা, কোথাও আরশোলা ও ইঁদুর। আবার কোথাও পাওয়া গিয়েছে মেয়াদ পেরিয়ে যাওয়া খাবার।

মুন্ডে নিজেও বলেন, এত বেশি অনিয়ম তিনি আশা করেননি। রয়টার্সের তরফে মুম্বইয়ের ২৫টি রাস্তার ধারের খাবারের দোকান ও রেস্তরাঁ ঘুরে দেখা হয়। দেখা যায়, নজরদারি বাড়তেই কিছু ব্যবসায়ী নিজেদের পদ্ধতিতেও বদল এনেছেন।(Mumbai Food Safety)

এক বিক্রেতা কৃত্রিম লাল রং বাদ দিয়ে প্রাকৃতিক লঙ্কা ব্যবহার শুরু করেছেন। অন্য এক দোকানে রান্নার তেল দিনে তিন বার বদলানো হচ্ছে। কর্মীদের গ্লাভস ও হেড ক্যাপ পরাও বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

খবরের কাগজে আর মোড়ানো যাবে না বড়া-পাও

মুম্বইয়ের জনপ্রিয় বড়া-পাও নিয়েও কড়া নির্দেশ দিয়েছেন মুন্ডে। খাবার মোড়াতে খবরের কাগজ ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছেন তিনি। খাদ্য নিরাপত্তার কারণেই এই সিদ্ধান্ত বলে জানিয়েছে দফতর।

মুন্ডের পদক্ষেপে সাধারণ মানুষের মধ্যেও সমর্থন তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে খাবারের পরিচ্ছন্নতা নিয়ে অভিযোগ থাকলেও অনেকেই তা মেনে নিয়েছিলেন। এবার সেই জমে থাকা ক্ষোভই প্রকাশ্যে আসছে বলে মনে করছেন ভোক্তা বিশেষজ্ঞ অঙ্কুর বিসেন। (Mumbai Food Safety)

তাঁর কথায়, “ভারতে এমন হয়”—এই যুক্তিতে মানুষ বহু বছর ধরে বিষয়টি মেনে নিয়েছেন। মুন্ডের অভিযান সেই জমে থাকা ক্ষোভকে সামনে এনেছে। তাঁর মতো কাউকে আগে দেখা যায়নি। তাঁর পদক্ষেপ মানুষকে আশাও দেখাচ্ছে।

ব্যবসায়ীদের অভিযোগও রয়েছে

তবে মুন্ডের দফতরের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত কড়াকড়ির অভিযোগও উঠেছে। কয়েকটি ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান আদালতের দ্বারস্থ হয়েছে।

একটি মামলায় আদালত খাদ্য দফতরকে ৫ লক্ষ টাকা জরিমানাও করে। অভিযোগ ছিল, খাবারের দোকানটি নিয়ম মেনে চলার পরও তার লাইসেন্স স্থগিত রাখা হয়েছিল। (Mumbai Food Safety)

এ নিয়ে মুন্ডে বলেন, আদালতের পর্যবেক্ষণকে তাঁরা গুরুত্ব দেন। কোথাও উন্নতির প্রয়োজন থাকলে সেটিও করা হবে।

এবার নজরে খোলা তেল

রেস্তরাঁ ও খাবারের দোকানের পর এবার নজর পড়েছে খোলা ভোজ্য তেলের বিক্রির উপর। মহারাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বা FDA জানিয়েছে, এটি নতুন কোনও নিষেধাজ্ঞা নয়। ২০১১ সাল থেকেই এই সংক্রান্ত খাদ্য নিরাপত্তার নিয়ম রয়েছে।

নিয়ম অনুযায়ী, সরাসরি ক্রেতার কাছে বিক্রি করা ভোজ্য তেল সিল করা, সিল ভাঙা হয়েছে কি না বোঝা যায় এমন প্যাকেট এবং সঠিক লেবেল-সহ দিতে হবে। (Mumbai Food Safety)

ড্রাম, ট্যাঙ্ক, ক্যান বা ট্যাঙ্কার থেকে সরাসরি ক্রেতার আনা পাত্রে তেল ঢেলে দেওয়া যাবে না। একইভাবে মূল প্যাকেটের সিল খুলে ছোট পাত্রে ভরে বিক্রিও নিয়মবহির্ভূত। তবে লাইসেন্সপ্রাপ্ত ব্যবসায়ীরা নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে বড় পরিমাণ তেল উৎপাদন বা পরিবহণ করতে পারবেন।

কেন খোলা তেলে আপত্তি?

FDA-র বক্তব্য, খোলা তেলে উৎপাদক, প্যাকেটজাতকারী, ব্যাচ নম্বর, তারিখ বা উৎসের মতো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য থাকে না। ফলে কোনও সমস্যা হলে তেলের উৎস খুঁজে বের করা কঠিন হয়ে পড়ে। (Mumbai Food Safety)

এ ছাড়া খোলা তেলে ভেজাল মেশানোর আশঙ্কাও বেশি। কম দামের তেল মিশিয়ে দামি তেল হিসেবে বিক্রি করা কিংবা এক ধরনের তেলকে অন্য ধরনের তেল বলে চালানোর সুযোগ থাকে।

বাতাস, তাপ ও আলোতে দীর্ঘ সময় থাকলেও তেলের মান নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অপরিষ্কার বা বারবার ব্যবহার করা পাত্র থেকে ধুলো, জল, পোকা, ধাতব কণা বা রাসায়নিক পদার্থও তেলে মিশতে পারে।

উৎপাদনের তারিখ, প্যাক করার তারিখ এবং ‘বেস্ট বিফোর’ তথ্য না থাকায় তেল কত পুরনো, সেটিও বোঝা কঠিন। (Mumbai Food Safety)

২০২০-তেই শেষ হয়েছিল ছাড়

FDA জানিয়েছে, মহারাষ্ট্রে আগে খোলা তেল বিক্রির ক্ষেত্রে সাময়িক ছাড় দেওয়া হয়েছিল। শেষবার সেই ছাড়ের মেয়াদ শেষ হয় ২০২০ সালে। তার পর সেটিকে স্থায়ী অনুমতি হিসেবে ধরা হয়নি।খাদ্য ব্যবসাগুলির Regulation অনুযায়ী মূল নিয়ম মেনে চলার কথা।

FDA-র দাবি, গুরুতর খাদ্য-নিরাপত্তাজনিত ঘটনা, যেমন ‘এপিডেমিক ড্রপসি’-র মতো পরিস্থিতির পর এই ধরনের নিয়ম আনা হয়েছিল। প্যাকেজিং ও লেবেলিংয়ের মাধ্যমে ভেজাল রোধ, উৎপাদনকারীর দায় নির্ধারণ, ব্যাচ চিহ্নিত করা এবং প্রয়োজন হলে পণ্য বাজার থেকে তুলে নেওয়া সহজ হয়। (Mumbai Food Safety)

৫.৩১ কোটি টাকার তেল বাজেয়াপ্ত

এই অভিযানে ইতিমধ্যেই বিপুল পরিমাণ তেল বাজেয়াপ্ত করেছে FDA। ২০২৫-২৬ সালে মহারাষ্ট্রে ১,২৪৭টি ভোজ্য তেলের নমুনা পরীক্ষা করা হয়।

তার মধ্যে ১,১৪২টি নির্ধারিত মান পূরণ করেছে। ৭৭টি নমুনা নিম্নমানের, ১৩টি অনিরাপদ এবং ১৫টি ভুল তথ্যযুক্ত বা মিসব্র্যান্ডেড বলে ধরা পড়েছে।

দফতর প্রায় ৫.৩১ কোটি টাকা মূল্যের ৩,২০,৭৮… পরিমাণ ভোজ্য তেল বাজেয়াপ্ত করেছে। শুধু বীড জেলাতেই প্রায় ১.৯৪ কোটি টাকা মূল্যের খোলা ভোজ্য তেল বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। (Mumbai Food Safety)

FDA জানিয়েছে, এই নিয়ম শুধু মহারাষ্ট্রে নয়, সারা দেশের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। ২০২২ সালের অগস্টে FSSAI-এর বিশেষ অভিযানের কথাও তুলে ধরেছে তারা। সেই অভিযানে বিভিন্ন রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল মিলিয়ে ২৭,৫০০ লিটারের বেশি খোলা ভোজ্য তেল বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিল।

ব্যবসায়ীদের চিন্তা, সমাধানের আশ্বাস

তবে খোলা তেলের উপর কড়াকড়ি নিয়ে চিন্তায় পড়েছেন ঐতিহ্যবাহী তেল ব্যবসায়ী এবং ছোট খুচরো বিক্রেতারা। তাঁদের আশঙ্কা, বাধ্যতামূলক প্যাকেজিংয়ের ফলে খরচ বাড়বে। ছোট ব্যবসায় তার প্রভাব পড়তে পারে।

মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়ণবীস জানিয়েছেন, ঐতিহ্যবাহী তেল ব্যবসায়ী ও ছোট বিক্রেতাদের ব্যবসা যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, আবার ভেজালও যাতে রোখা যায়, তার জন্য FDA-কে স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিওর বা SOP তৈরির নির্দেশ দেওয়া হবে।

FDA-র বক্তব্য, সাধারণ মানুষ চাইলে ছোট পরিমাণেও প্যাকেটজাত তেল কিনতে পারবেন। ২০০ মিলিলিটার, ৫০০ মিলিলিটার এবং এক লিটারের প্যাকেট পাওয়া যাবে। এর মধ্যে পাউচ তুলনামূলক কম খরচের প্যাকেজিং বলেও জানিয়েছে দফতর।

খাবারের দোকান থেকে তেলের বাজার—মুন্ডের অভিযানের পরিধি যে ক্রমেই বাড়ছে, তা স্পষ্ট। তাঁর বার্তা একটাই—খাবারের মান ও নিরাপত্তার সঙ্গে আপস করা যাবে না। (Mumbai Food Safety)

আরও পড়ুন :- VIP সংস্কৃতিতে ‘না’, সাদা তোয়ালে সরিয়ে ভাইরাল IAS অফিসার তুকারাম মুন্ডে


Ranita Saha

নতুন নতুন বিষয় জানার ইচ্ছে থেকেই সাংবাদিকতার পেশায় আসা। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতার স্নাতকোত্তরের ছাত্রী। কলেজ জীবন থেকে বিভিন্ন পত্রপত্রিকার লেখালেখি শুরু। বাংলা, ইংরেজির পাশাপাশি হিন্দিতেও স্বচ্ছন্দ। রাজনীতি ছাড়াও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক এবং বিনোদন সংক্রান্ত খবর লিখতে ভালো লাগে। অবসর সময়ে বই একমাত্র বন্ধু। পড়ালেখার পাশাপাশি গান, নাচ এবং আঁকা ভালোবাসার বিষয়।

Join WhatsApp

Join Now

Join Telegram

Join Now

Leave a Comment