প্রতিটি ফুটবল ম্যাচে আমরা একই দৃশ্য দেখে থাকি —৪৫ মিনিটের দুটি অর্ধ, মাঝখানে বিরতি, তারপর শেষ বাঁশি। (Football Match Duration) কিন্তু কখনও কি ভেবেছেন, কেন ম্যাচের দৈর্ঘ্য ঠিক ৯০ মিনিট? ৮০ বা ১০০ মিনিট নয় কেন? এর পেছনে রয়েছে দেড়শো বছরেরও বেশি পুরনো এক ইতিহাস, যেখানে লন্ডন ও শেফিল্ডের দুই ফুটবল সংস্কৃতির মতবিরোধই তৈরি করে দেয় আধুনিক ফুটবলের সবচেয়ে পরিচিত নিয়ম।
এক সময় ফুটবলের ছিল না নির্দিষ্ট সময়সীমা

আজকের মতো ফুটবল সবসময় এত নিয়মবদ্ধ ছিল না। উনিশ শতকের ইংল্যান্ডে বিভিন্ন অঞ্চল ও ক্লাব নিজেদের মতো নিয়মে খেলত। (Football Match Duration) কোথাও ম্যাচ চলত এক ঘণ্টা, কোথাও আবার দুই ঘণ্টা পর্যন্ত। বিশেষ করে শেফিল্ড ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন দীর্ঘ সময়ের ম্যাচে বিশ্বাস করত, অন্যদিকে লন্ডনের ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের অধীনে থাকা ক্লাবগুলো চাইত তুলনামূলক ছোট সময়ের খেলা। ফলে দুই অঞ্চলের দল মুখোমুখি হলে ম্যাচ শুরুর আগেই সময় নিয়ে রীতিমত আলোচনা করতে হতো। এই ভিন্নতা শুধু বিভ্রান্তিই তৈরি করেনি, বরং ফুটবলকে বৃহত্তর পরিসরে ছড়িয়ে পড়ার ক্ষেত্রেও বড় বাধার সৃষ্টি করেছিল।
লন্ডন–শেফিল্ডের আপসেই জন্ম নেয় ৯০ মিনিট

১৮৬৬ সালে লন্ডন ও শেফিল্ডের একটি আন্তঃঅ্যাসোসিয়েশন ম্যাচের আগে আবারও সামনে আসে একই প্রশ্ন—ম্যাচ কতক্ষণ চলবে? (Football Match Duration) শেফিল্ডের দাবি ছিল দুই ঘণ্টা, আর লন্ডনের পক্ষ চাইছিল কম সময়। শেষ পর্যন্ত দুই পক্ষই আপসে রাজি হয়। ঠিক হয়, দুই অর্ধ হবে ৪৫ মিনিট করে, অর্থাৎ মোট ৯০ মিনিট। এই সিদ্ধান্তের পেছনে কোনও বৈজ্ঞানিক গবেষণা বা বিশেষ কোনো বিশ্লেষণ ছিল না। এটি ছিল সম্পূর্ণ বাস্তবসম্মত একটি সমঝোতা। পরে দেখা যায়, এই সময়সীমা খেলোয়াড়দের জন্যও উপযুক্ত এবং দর্শকদের কাছেও গ্রহণযোগ্য। ধীরে ধীরে অন্যান্য ক্লাব ও সংগঠনও একই নিয়ম অনুসরণ করতে শুরু করে।
সত্যিই কি পেনাল্টি দেওয়া হয়নি মিশরকে? মুখ খুললেন FIFA-র রেফারি প্রধান
১৮৯৭ সালে আইনে পরিণত হয় ৯০ মিনিটের নিয়ম

যদিও ১৮৬৩ সালে ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন প্রতিষ্ঠিত হয়, তবুও ৯০ মিনিটকে আনুষ্ঠানিক নিয়ম হিসেবে স্বীকৃতি পেতে আরও তিন দশকের বেশি সময় লাগে। (Football Match Duration) অবশেষে ১৮৯৭ সালে ফুটবলের আইনে নির্ধারিত হয় যে প্রতিটি ম্যাচ হবে ৯০ মিনিটের। এর আগে দুই দল চাইলে পারস্পরিক সম্মতিতে সময় পরিবর্তন করতে পারত। একই বছর নকআউট প্রতিযোগিতার জন্য অতিরিক্ত সময় বা এক্সট্রা টাইমের বিধানও যুক্ত হয়। তবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এটি নিয়মিতভাবে ব্যবহৃত হতে শুরু করে ১৯২০ সালের অলিম্পিকের পর।
এত বছরেও কেন বদলায়নি এই নিয়ম?

ফুটবলের কৌশল, প্রযুক্তি, নিয়ম—সবকিছুই সময়ের সঙ্গে বদলেছে। এসেছে VAR, পাঁচটি বদলি, গোললাইন প্রযুক্তি। কিন্তু (Football Match Duration) ম্যাচের ৯০ মিনিট অপরিবর্তিত থেকেছে। ২০১৭ সালে আন্তর্জাতিক ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন বোর্ড (IFAB) একটি প্রস্তাব দেয়, যেখানে ৯০ মিনিটের বদলে স্টপ-ক্লক পদ্ধতিতে ৬০ মিনিট কার্যকর খেলার কথা বলা হয়েছিল, যাতে সময় নষ্টের প্রবণতা কমানো যায়। কিন্তু সেই প্রস্তাব বাস্তবায়িত হয়নি। কারণ শুধু খেলার নিয়ম নয়, সম্প্রচার সূচি, বিজ্ঞাপন, স্টেডিয়াম পরিচালনা, ম্যাচডে আয়োজন—সবকিছুই ৯০ মিনিটকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে। ফলে এই কাঠামো বদলানো কার্যত অত্যন্ত কঠিন।
ঘড়িতে ৯০ মিনিট, কিন্তু খেলা চলে কতক্ষণ?

বাস্তবে একটি আধুনিক ফুটবল ম্যাচে বল সচল থাকে ৯০ মিনিটের বেশি। বদলি, চোট, গোল উদযাপন, VAR পরীক্ষা ও সময় নষ্টের কারণে উল্লেখযোগ্য সময় খেলা বন্ধ থাকে। ইউরোপের শীর্ষ লিগগুলোর পরিসংখ্যান বলছে, একটি ম্যাচে গড়ে মাত্র ৫৫ থেকে ৫৮ মিনিট বল খেলায় থাকে। এই বাস্তবতা মাথায় রেখেই ২০২২ বিশ্বকাপে ফিফা রেফারিদের কঠোরভাবে প্রকৃত নষ্ট হওয়া সময় যোগ করার নির্দেশ দেয়। ফলে অনেক ম্যাচেই ১০ মিনিট বা তার বেশি স্টপেজ টাইম দেখা যায়। ইংল্যান্ড–ইরান ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধও নির্ধারিত সময়ের অনেক বেশি দীর্ঘ হয়েছিল।
ফ্রান্স–মরক্কো আবার মুখোমুখি, বিশ্বকাপে শেষ সাক্ষাতে কী ঘটেছিল, মনে আছে সেই গল্প?
এক সময় লন্ডন ও শেফিল্ডের দুই পক্ষের আপস হিসেবে শুরু হওয়া ৯০ মিনিটের নিয়ম আজ বিশ্বফুটবলের পরিচয়ের অংশ। শতাধিক বছর ধরে অসংখ্য পরিবর্তনের মধ্যেও এই সময়সীমা টিকে আছে। তাই ম্যাচের শেষ মুহূর্তে ঘড়িতে ৮৯ মিনিট দেখে যে উত্তেজনা তৈরি হয়, তার শিকড় লুকিয়ে রয়েছে ১৮৬৬ সালের সেই ঐতিহাসিক সমঝোতার মধ্যেই।











1 thought on “ফুটবল ম্যাচে ৯০ মিনিটের, নেপথ্যের ইতিহাস জানলে অবাক হবেন”