ভারতীয় রেলের ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো। ১৭ জুলাই, শুক্রবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি হরিয়ানার জিন্দ স্টেশন থেকে দেশের প্রথম হাইড্রোজেনচালিত ট্রেনের উদ্বোধন করলেন। জিন্দ থেকে সোনিপত পর্যন্ত ৮৯ কিলোমিটার রুটে চলবে এই ট্রেন। ডিজেলের পরিবর্তে হাইড্রোজেন জ্বালানি ব্যবহার করায় এটি পরিবেশের জন্য অনেক বেশি নিরাপদ। শুধু তাই নয়, এই ট্রেনে রয়েছে একাধিক আধুনিক প্রযুক্তি ও উন্নত নিরাপত্তা ব্যবস্থাও। সব কিছু ঠিকঠাক থাকলে ভবিষ্যতে দেশের অন্যান্য রুটেও এই পরিষেবা চালু হতে পারে। (Hydrogen Train)
কীভাবে চলবে এই ট্রেন?
এই ট্রেনে ডিজেল ইঞ্জিন নেই। এর পরিবর্তে রয়েছে হাইড্রোজেন ফুয়েল সেল প্রযুক্তি। এই প্রযুক্তিতে হাইড্রোজেন ও অক্সিজেনের মধ্যে রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটিয়ে বিদ্যুৎ উৎপন্ন করা হয়। এতে ব্যবহার করা হয়েছে প্রোটন এক্সচেঞ্জ মেমব্রেন ফুয়েল সেল (PEMFC), যা বিশেষ ধরনের PFSA পলিমার মেমব্রেনের সাহায্যে এই বিক্রিয়াটি সম্পন্ন করে। সেই বিদ্যুৎ দিয়েই ট্রেনের মোটর চলে। সবচেয়ে বড় কথা, এই প্রক্রিয়ায় ধোঁয়া বা কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গত হয় না। ফলে বায়ুদূষণও অনেকটাই কমে। ট্রেন চলার সময় মূলত জলীয় বাষ্প এবং সামান্য তাপ উৎপন্ন হয়।
ট্রেনটির প্রধান বৈশিষ্ট্য কী?
- জিন্দ-সোনিপত ৮৯ কিলোমিটার রুটে চলবে এই ট্রেন।
- ট্রেনে রয়েছে মোট ১০ টি কোচ।
- একসঙ্গে প্রায় ২,৬০০ জন যাত্রী যাতায়াত করতে পারবেন।
- প্রতিটি ড্রাইভিং কারে রয়েছে ১,২০০ কিলোওয়াট ক্ষমতার হাইড্রোজেন ফুয়েল সেল সিস্টেম।
- ট্রেনটির সর্বোচ্চ নকশাগত গতি ঘণ্টায় ১১০ কিলোমিটার। তবে আপাতত এটি ঘণ্টায় ৭৫ কিলোমিটার গতিতে চলবে।
- সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে এই ট্রেন তৈরি করা হয়েছে।
- জিন্দ জংশন, গোহানা জংশন এবং সোনিপতের মধ্যে চলাচল করবে এই ট্রেন। পথে জিন্দ সিটি, পান্ডু পিন্দারা জংশন, ললিত খেরা হল্ট, ভামভেওয়া, ইসাপুর খেরি হল্ট, বুটানা হল্ট, খান্দরাই হল্ট, রাবরা হল্ট, লাঠ হল্ট, মোহানা, বারওয়াসনি হল্ট এবং সোনিপত নিউ স্টেশনেও ট্রেনটির নির্ধারিত স্টপেজ থাকবে। (Hydrogen Train)
নিরাপত্তায় বিশেষ জোর
হাইড্রোজেন অত্যন্ত দাহ্য গ্যাস হওয়ায় যাত্রীদের নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে এই ট্রেনে অত্যাধুনিক সুরক্ষা ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
- ট্রেনের বিভিন্ন জায়গায় হাইড্রোজেন লিকেজ শনাক্তকারী সেন্সর বসানো হয়েছে।
- আগুন, ধোঁয়া বা অতিরিক্ত তাপমাত্রা শনাক্ত করার জন্য আলাদা সেন্সর রয়েছে।
- কোনও সমস্যা দেখা দিলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে হাইড্রোজেনের সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাবে।
- জরুরি পরিস্থিতিতে চালক একটি বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থার মাধ্যমে ট্রেনকে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যেতে পারবেন।
- চালকের কেবিনে ডিজিটাল মনিটরের মাধ্যমে সব সময় ট্রেনের বিভিন্ন যন্ত্রাংশের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা যাবে।
- নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও স্বাস্থ্য পরীক্ষা করার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
লাগবে না ডিজেল, দেশের প্রথম হাইড্রোজেনচালিত ট্রেন উদ্বোধন প্রধানমন্ত্রীর, কোন রুটে চলবে?
হাইড্রোজেন ভরার জন্য বিশেষ স্টেশন
এই প্রকল্পের জন্য হরিয়ানার জিন্দে দেশের বৃহত্তম হাইড্রোজেন রিফুয়েলিং স্টেশন তৈরি করা হয়েছে। এখান থেকেই ট্রেনে হাইড্রোজেন ভরা হবে। ভবিষ্যতে আরও হাইড্রোজেন ট্রেন চালানোর পরিকল্পনা থাকায় এই অবকাঠামো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে বলেও ধারণা। (Hydrogen Train)
কারা তৈরি করেছে এই ট্রেন?
এই ট্রেনটি সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি হয়েছে। এই হাইড্রোজেন ট্রেন প্রকল্পটি রেলের গবেষণা, নকশা ও মান নির্ধারণকারী সংস্থা RDSO-এর তৈরি নকশা ও প্রযুক্তিগত মানদণ্ড মেনে তৈরি করা হয়েছে। সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে ভারতে তৈরি হওয়া এই ট্রেন ‘আত্মনির্ভর ভারত’-এর ভাবনাকে আরও শক্তিশালী করেছে।
কেন এই ট্রেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
ভারতের পরিবেশবান্ধব রেল পরিষেবার ক্ষেত্রে এটি একটি বড় পদক্ষেপ। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে—
- ডিজেলের ব্যবহার কমবে।
- কার্বন নির্গমন উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে।
- পরিবেশ দূষণ কমবে।
- জ্বালানি আমদানির উপর নির্ভরতা কমবে।
- ভবিষ্যতে ভারতীয় রেল আরও আধুনিক ও টেকসই হয়ে উঠবে। (Hydrogen Train)
ভারতের প্রথম হাইড্রোজেনচালিত ট্রেন শুধু একটি নতুন ট্রেন নয়, বরং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিনির্ভর ভবিষ্যতের দিকে ভারতীয় রেলের বড় পদক্ষেপ। এই প্রকল্প সফল হলে আগামী দিনে দেশের আরও বহু রুটে হাইড্রোজেনচালিত ট্রেন চালানোর সম্ভাবনা তৈরি হবে।












