এবছরের মতো দুর্গাপুজো শেষ হলেও পুজো নিয়ে বাঙালির আবেগ তো অমলিন। তাই এখন থেকেই আগামী বছরগুলোর পুজোর দিনক্ষণ সম্পর্কে মানুষের মধ্যে আগ্রহ জন্মেছে। কিন্তু ২০২৮ সালের পুজোর দিনক্ষণ নিয়ে ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে বিভ্রান্তি। দেখা যাচ্ছে ওই বছর নাকি মাত্র ১৫ দিনের ব্যবধানে দুর্গাপুজো হতে পারে। এমন খবর শুনে অবাক হওয়াই স্বাভাবিক। তবে এর পিছনে কোনও অলৌকিক ঘটনা নেই। বরং এর মূল কারণ হলো, দুর্গাপুজোর দিনক্ষণ নির্ধারণে ব্যবহৃত দুটি আলাদা পঞ্জিকার গণনাপদ্ধতি। এই দুই পঞ্জিকার হিসাবের ফারাকের জেরেই ২০২৮ সালে দুর্গাপুজোর তারিখে বড়সড় পার্থক্য দেখা দিতে পারে বলে জল্পনা তৈরি হয়েছে।
হিন্দু পঞ্জিকা অনুযায়ী, দুর্গাপুজোর দিনক্ষণ নির্ধারণে মূলত দুটি সিদ্ধান্ত প্রচলিত। একটি হলো ‘দৃকসিদ্ধ’ বা ‘বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত’, অন্যটি ‘সূর্যসিদ্ধান্ত’ বা ‘গুপ্তপ্রেস’ পঞ্জিকা। বেণীমাধব শীলের পঞ্জিকাও সূর্যসিদ্ধান্তের গণনা অনুসরণ করে। এই দুই পদ্ধতিতে তিথি ও গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থান নির্ণয়ের হিসাবে পার্থক্য থাকায় কোনও কোনও বছরে পুজোর দিনক্ষণেও ফারাক দেখা দিতে পারে।
Durga Puja 2028: কেন দু’বার দুর্গাপুজোর সম্ভাবনা?
বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত মেনে চলে বেলুড় মঠ ও রামকৃষ্ণ মিশন। অন্যদিকে, বাংলার বহু বারোয়ারি দুর্গাপুজোয় সূর্যসিদ্ধান্ত বা গুপ্তপ্রেস পঞ্জিকা অনুসরণ করা হয়। ফলে একই বছরে দুই পঞ্জিকার হিসাব অনুযায়ী দুর্গাপুজোর দিন আলাদা হতে পারে। ২০২৮ সালেও তেমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। দুই পঞ্জিকার হিসাবের ব্যবধান প্রায় ১৫ দিন পর্যন্ত হতে পারে বলে দাবি করা হচ্ছে।
তবে ২০২৮ সালের দুর্গাপুজোর চূড়ান্ত দিনক্ষণ নিয়ে এখনই নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না। গুপ্তপ্রেস পঞ্জিকার কর্ণধার অরিজিৎ রায়চৌধুরী সংবাদমাধ্যমে জানিয়েছেন, তাঁদের পঞ্জিকা মূলত সূর্যসিদ্ধান্ত অনুসরণ করে। ২০২৮ সালের নির্ঘণ্ট নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর সময় এখনও আসেনি। বর্তমানে ২০২৭ সালের পঞ্জিকার গণনা চলছে। সেই বছরেই অষ্টমী ও নবমী তিথির দিনক্ষণ নিয়ে দু’দিন ধরে বিস্তৃত হওয়ার মতো কিছু পার্থক্য দেখা যাচ্ছে বলে তিনি জানিয়েছেন।
১৯৮০ সালেও ঘটেছিল এমন ঘটনা
পঞ্জিকার হিসাবের কারণে দুর্গাপুজোর দিনক্ষণে বড়সড় ফারাক অবশ্য এই প্রথম নয়। অতীতেও এমন ঘটনা ঘটেছে। ১৯৮০ সালে দুই পঞ্জিকার গণনার পার্থক্যের কারণে দুর্গাপুজোর দিনক্ষণে প্রায় এক মাসের ব্যবধান তৈরি হয়েছিল বলে জানা যায়। পরিস্থিতি এমন হয়েছিল যে, একটি পঞ্জিকা অনুযায়ী যখন মহালয়া পালিত হচ্ছিল, অন্য পঞ্জিকার হিসাবে তখন কালীপুজোর সময়। আবার একটি পঞ্জিকায় মহানবমী পালিত হওয়ার সময় অন্য পঞ্জিকা অনুযায়ী চলছিল জগদ্ধাত্রীপুজো। (Durga Puja 2028)
লক্ষ্মীপুজোতে কমল সোনার দাম, আজ কোন শহরে কত দাম?
পঞ্জিকা ব্যবসায়ী পূর্ণচন্দ্র শীলের বক্তব্য অনুযায়ী, অতীতে এমন পরিস্থিতিও তৈরি হয়েছিল, যখন বিশুদ্ধ সিদ্ধান্তের হিসাব মেনে দুর্গাপুজো কার্তিক মাসে পালিত হয়েছিল, অথচ সূর্যসিদ্ধান্ত অনুযায়ী তা হয়েছিল আশ্বিন মাসে। ২০২৮ সালেও যদি একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়, তবে তা যথেষ্ট ব্যতিক্রমী ঘটনা হবে।
পুজোর দিন আলাদা হলেও শাস্ত্রীয় নিয়মে ভুল নেই
এই সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা শুরু হলেও শাস্ত্রজ্ঞদের বক্তব্য, দুটি পঞ্জিকার গণনাপদ্ধতির মধ্যে কোনও বিরোধ বা ভুল রয়েছে, এমনটা বলা যায় না। দুই পদ্ধতিই নিজস্ব গণনা ও শাস্ত্রীয় নিয়ম মেনে তিথি নির্ধারণ করে। ফলে পঞ্জিকাভেদে পুজোর দিনক্ষণ আলাদা হলেও তা নিয়ে বিভ্রান্ত হওয়ার প্রয়োজন নেই। ভক্তরা চাইলে উভয় পঞ্জিকা অনুযায়ী আয়োজিত দুর্গাপুজোয় অংশ নিতে এবং নিয়ম মেনে অঞ্জলি দিতে পারেন।
সব মিলিয়ে, ২০২৮ সালে সত্যিই ১৫ দিনের ব্যবধানে দু’বার দুর্গাপুজো হবে কি না, তা জানতে অপেক্ষা করতে হবে চূড়ান্ত পঞ্জিকা প্রকাশ পর্যন্ত।












