ডঃ দীপক কুমার দাস
মেডিসিন বিশেষজ্ঞ
এক সময় হৃদরোগে অধিকাংশই বয়স্ক মানুষ আক্রান্ত হতেন। ধারণা ছিল, ৬০ বা ৭০ বছরের বয়সে এই হৃদরোগের সমস্যা দেখা দেয়। কিন্তু বর্তমান সময়ের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। আজ ২৫ থেকে ৪৫ বছরের তরুণ – তরুণী আক্রান্ত হচ্ছেন। এমনকী কর্মজীবনের শুরুতেই হঠাৎ হার্ট অ্যাটাক, হৃদযন্ত্র বিকল হয়ে মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। এই প্রবণতা শুধু ভারতেই নয়, সমগ্র বিশ্বের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। (Heart Disease)
কেন বাড়ছে তরুণদের হৃদরোগ?
১. অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস: বর্তমান প্রজন্মের খাদ্যাভ্যাসে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। ঘরের তৈরি পুষ্টিকর খাবারের পরিবর্তে ফাস্ট ফুড, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, কোমল পানীয় এবং অতিরিক্ত তেল-চর্বিযুক্ত খাবার খাওয়া বেড়েছে। এসব খাবারে উচ্চমাত্রার ট্রান্স ফ্যাট, লবণ এবং চিনি থাকে, যা ধীরে ধীরে রক্তনালীতে চর্বি জমিয়ে হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়। (Heart Disease)
২. শারীরিক পরিশ্রমের অভাব: ডিজিটাল যুগে অধিকাংশ মানুষ দীর্ঘসময় কম্পিউটার, মোবাইল বা অফিসের চেয়ারে বসে কাটাচ্ছেন। নিয়মিত হাঁটা, দৌড়ানো বা ব্যায়ামের অভাবে শরীরে অতিরিক্ত চর্বি জমতে থাকে এবং ওজন বৃদ্ধি পায়। এর ফলে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবfটিস এবং হৃদরোগের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।
৩. মানসিক চাপ ও উদ্বেগ: আধুনিক জীবনে প্রতিযোগিতা, কর্মসংস্থানের অভাব, আর্থিক এবং সামাজিক চাপ তরুণদের মানসিকভাবে ক্লান্ত করে তুলেছে। দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ শরীরে কর্টিসল সহ স্ট্রেস হরমোনের মাত্রা বৃদ্ধি করে, যা হৃদযন্ত্রের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
৪. ধূমপান ও মাদকাসক্তি: অনেক তরুণ-তরুণী ধূমপান, ভেপিং এবং অন্যান্য নেশাজাতীয় দ্রব্যের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছেন। নিকোটিন রক্তনালীকে সঙ্কুচিত করে এবং যার দরুন হৃদযন্ত্রের উপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে। অতিরিক্ত অ্যালকোহল পানও রক্তনালীতে চর্বি জমিয়ে সঙ্কুচিত করে। এতে তরুণদের হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বেড়ে যায়।
৫. ডায়াবিটিস ও স্থূলতা: ভারতে ডায়াবিটিস ও স্থূলতার হার দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই দুটি হার্ট অ্যাটাকের প্রধান ঝুঁকির কারণ। রক্তে অতিরিক্ত শর্করা রক্তনালীকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়।
তরুণদের মধ্যে হৃদরোগের সাধারণ লক্ষণ:
অনেক সময় তরুণরা হৃদরোগের লক্ষণকে গুরুত্ব দেন না। ফলে চিকিৎসা নিতে দেরি হয়। (Heart Disease)
বেবি পাউডার থেকে ক্যানসার ? মামলা মেটাতে বিপুল টাকার প্রস্তাব Johnson & Johnson-এর
কিছু গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ—
১. বুকের মাঝখানে চাপ বা ব্যথা অনুভব করা।
২. সামান্য পরিশ্রমে হাঁপিয়ে যাওয়া বা শ্বাসকষ্ট হওয়া।
৩. অস্বাভাবিক ক্লান্তি।
৪. বুক ধড়ফড় করা।
৫. মাথা ঘোরানো বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়া।
৬. ঘাড় বা চোয়াল বা বাম হাতে ব্যথা হওয়া।
উপরিউক্ত সমস্যাগুলো দেখা দিলে অবিলম্বে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। (Heart Disease)
ভারতের বর্তমান পরিস্থিতি:
ভারত বর্তমানে বিশ্বের হৃদযন্ত্রে সমস্যার মধ্যে প্রথম সারিতেই আছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতীয়দের মধ্যে হৃদরোগ তুলনামূলক মধ্যে দেখা দেয়। এর কারণ, ডায়াবিটিস এবং জীবনযাত্রার পরিবর্তন। (Heart Disease)
গ্রামাঞ্চলের তুলনায় শহরাঞ্চলে হৃদরোগের প্রকোপ বেশি হলেও বর্তমানে গ্রামাঞ্চলেও এই রোগ দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে এটি জাতীয় জনস্বাস্থ্য সমস্যায় পরিণত হচ্ছে।
হৃদরোগ প্রতিরোধ করার উপায়
১. নিয়মিত ব্যায়াম: প্রতিদিন অন্তত ৩০ থেকে ৪৫ মিনিট দ্রুত হাঁটা বা শরীর চর্চা করা।
২. সুষম খাদ্য গ্রহণ: শাকসবজি, ফলমূল, মাছ, ডাল ও আঁশযুক্ত খাবার বেশি করে খেতে হবে। অতিরিক্ত লবণ, চিনি এবং তৈলাক্ত খাবার এড়িয়ে চলতে হবে।
৩. ধূমপান বর্জন: ধূমপান সম্পূর্ণভাবে পরিত্যাগ করতে হবে। এটা হৃদরোগ প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপগুলোর একটি।
৪. মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ: যোগব্যায়াম, ধ্যান এবং পর্যাপ্ত ঘুম মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে।
৫. নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা: রক্তচাপ, রক্তে শর্করা, কোলেস্টেরল এবং ওজন নিয়মিত পরীক্ষা করা উচিত।
৬.সমাজ ও সরকারের ভূমিকা: শুধু ব্যক্তিগত নয়, সমাজ ও সরকারেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। স্কুল-কলেজে স্বাস্থ্য শিক্ষা, কর্মস্থলে স্বাস্থ্য সচেতনতা কর্মসূচি, ধূমপান বিরোধী প্রচার এবং জনস্বাস্থ্য অবকাঠামোর উন্নয়ন হৃদরোগ প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে।
তরুণ প্রজন্মের মধ্যে হৃদরোগের ক্রমবর্ধমান প্রবনতা আমাদের জন্য একটা সতর্কবার্তা। আজ সচেতন না হলে আগামী দিনে এই নীরব রোগ সমাজ ও জাতির জন্য আরও বড় বোঝা হয়ে দাঁড়াবে। সুস্থ হৃদয়ই সুস্থ জীবনের ভিত্তি আর সেই ভিত্তি রক্ষার দায়িত্ব আমাদের সকলের। (Heart Disease)
আরও পড়ুন :- পড়ুয়াদের স্বাস্থ্য রক্ষায় পদক্ষেপ, এই রাজ্যে স্কুল ক্যান্টিন ও আশপাশে জাঙ্ক ফুড বিক্রি মানা












