তিস্তার জলে ছোট্ট একটি শুঁড় বারবার ভেসে উঠছে। পরক্ষণেই প্রবল স্রোতে ডুবে যাচ্ছে গোটা শরীর। গজলডোবার ১২ নম্বর মিলন পল্লির অজয় দাস, মিঠু দাসদের চোখে পড়েছিল এই দৃশ্য। সোমবার ভোরে মাছ ধরতে বেরিয়ে এমন দৃশ্য দেখেই বদলে যায় তাঁদের সকাল। মাছ ধরার জাল ফেলে অসহায় হস্তিশাবককে বাঁচানোর লড়াইয়ে নেমে পড়েন পাঁচ মৎস্যজীবী। শেষ পর্যন্ত প্রায় ১০০ কেজি ওজনের শাবকটিকে উদ্ধার করে মায়ের কাছে ফিরিয়ে দেন তাঁরা।(Elephant Calf Rescue)
জলে ঝাঁপ অজয়-মিঠুর
সোমবার ভোরে অজয় দাস, মিঠু দাস, গোপাল, বিশ্বনাথ ও বাবলু দাস নৌকা নিয়ে তিস্তায় মাছ ধরতে গিয়েছিলেন। আচমকাই তাঁরা দেখতে পান, স্রোতের সঙ্গে ভেসে যাচ্ছে একটি হস্তি শাবক। কখনও তার শুঁড় জলের উপরে উঠছে, আবার পরক্ষণেই মাথা ডুবে যাচ্ছে। (Elephant Calf Rescue)পরে বনকর্মীদের কাছ থেকে জানা যায়, শাবকটির বয়স মাত্র দিন দশেক। পরিস্থিতি বুঝে দেরি করেননি অজয় ও মিঠু। ডিঙি নৌকা ছেড়ে দু’জন জলে ঝাঁপিয়ে পড়েন। গোপাল, বিশ্বনাথ ও বাবলু নৌকা নিয়ে তাঁদের পিছু নেন।
চারজন মিলে নৌকায় তোলা
শাবকটির কাছে পৌঁছনোর পরও বিপদ কাটেনি। প্রবল স্রোতের মধ্যে প্রায় ১০০ কেজির প্রাণীকে তোলা সহজ ছিল না। বাবলুর পরামর্শে গোপাল ও বিশ্বনাথও জলে নামেন। চারজন মিলে ধাক্কা দিয়ে শেষ পর্যন্ত শাবকটিকে নৌকায় তুলতে সক্ষম হন। ততক্ষণে জল খেয়ে প্রায় নিস্তেজ হয়ে পড়েছিল শাবকটি। কোনওরকমে নৌকা নিয়ে নদীর চরে পৌঁছন মৎস্যজীবীরা। সেখানে শুশ্রূষা শুরু হলে ধীরে ধীরে সাড়া দিতে থাকে ছোট্ট প্রাণটি। (Elephant Calf Rescue)
মায়ের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছিল
খবর ছড়িয়ে পড়তেই তিস্তার দুই পাড়ে কয়েক হাজার মানুষ ভিড় করেন। মানুষের ভিড়ে আতঙ্কিত হয়ে শাবকটি তর্জন-গর্জন শুরু করে। পরিস্থিতি সামাল দিতে বনকর্মীরা তার চারটি পা দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখেন। পরে বনকর্মীরা জানতে পারেন, শাবকটি মায়ের সঙ্গেই তিস্তার পাড়ে এসেছিল। প্রবল জলের তোড়ে কোনওভাবে মায়ের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নদীতে ভেসে যায় সে। সন্তানকে হারিয়ে মা হাতিটিও তিস্তার চরে ছুটে বেড়াচ্ছিল। (Elephant Calf Rescue)
উদ্ধারকারী মিঠু দাস বলেন, “শাবকটিকে উদ্ধার করতে জলে নামার সময় এত কিছু ভাবিনি। ভেবেছিলাম, ঠেলেঠুলে চরের দিকে নিয়ে যাব। কিন্তু জল খেয়ে হাতির ছানাটি প্রায় কাহিল হয়ে গিয়েছিল। তাই নৌকায় তুলে নিয়ে চরে পৌঁছে দিই।”
মাছ ধরতে গিয়ে এলাকার ‘হিরো’
অজয় দাসের কাছে ঘটনাটি পুরনো স্মৃতিও ফিরিয়ে এনেছে। তিনি বলেন, “প্রায় আট বছর আগে তিস্তা নদীতে এমন একটি ঘটনা ঘটেছিল। তখন আমরা বয়সে অনেকটাই ছোট। এবার আবার একটি শাবককে মায়ের কাছে ফিরিয়ে দিতে পারলাম। এর থেকে বেশি তৃপ্তির আর কী হতে পারে!” তিস্তা ব্যারাজ থেকে ওদলাবাড়ির দিকে যাওয়ার পথে পড়ে ১২ নম্বর মিলন পল্লি। তিস্তার দুই পাড়ের এই এলাকায় সরকারি খাস জমিতে কয়েক হাজার মানুষের বাস। অধিকাংশের জীবিকা মাছ ধরা। কেউ আনাজ চাষ করেন, কেউ ছোট পুকুরে মাছ চাষ করেন। বাসিন্দাদের সংগঠন ‘নর্থ বেঙ্গল ফিশারম্যানস ফোরাম’-এর কর্মকর্তা বাবলু দাসও ছিলেন উদ্ধারে সামনের সারিতে।
মঙ্গলবার বাবলু বলেন, “প্রতিদিন সকালে এলাকার যুবকরা তিস্তা নদীতে মাছ ধরতে নামেন। বোরোলি মাছই বেশি ধরা পড়ে এবং তা গজলডোবা বাজারে বিক্রি হয়। মাছ ধরতে গিয়ে নানা অভিজ্ঞতা হয়। কিন্তু এভাবে একটি হস্তিশাবককে উদ্ধার করে মায়ের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার অভিজ্ঞতার সঙ্গে আর কোনও কিছুরই তুলনা হয় না।” মাছ ধরতে বেরিয়ে সেদিন পাঁচ মৎস্যজীবী শুধু একটি প্রাণই বাঁচাননি। অজয়, মিঠু, গোপাল, বিশ্বনাথ ও বাবলু এখন ১২ নম্বর মিলন পল্লির মানুষের কাছে নায়ক। তিস্তার জলে প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে শাবকটিকে বাঁচিয়ে তাঁরা হয়ে উঠেছেন এলাকার ‘হিরো’। (Elephant Calf Rescue)











1 thought on “তিস্তার জলে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই, হস্তিশাবককে বাঁচিয়ে হিরো গজলডোবার ৫ মৎসজীবী”
Comments are closed.