কালীপুজো মানেই অমাবস্যার ঘন অন্ধকারেও আলোর উৎসব। তবে প্রদীপ জ্বালানো কিংবা আতশবাজির আনন্দের বাইরেও এই পুজোর রয়েছে গভীর ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক তাৎপর্য। মানুষের জীবনের সমস্ত অন্ধকার, নেতিবাচকতা ও অশুভ শক্তিকে দূর করে আলোর পথে এগিয়ে যাওয়াই কালীপুজো বা দীপাবলির মূল বার্তা। ‘অন্ধকারের উৎস হতে উসারিত আলো’—এই ভাবনাই যেন কালী আরাধনার মূল দর্শন।
Kali Puja: কীভাবে আবির্ভাব মা কালীর?
সনাতন ধর্মীয় শাস্ত্র অনুযায়ী, মা কালীর আবির্ভাব নিয়ে একাধিক পৌরাণিক কাহিনি রয়েছে। কথিত আছে, একসময় শুম্ভ ও নিশুম্ভ নামে দুই অসুরের অত্যাচারে দেবলোক-সহ গোটা পৃথিবী বিপর্যস্ত হয়ে উঠেছিল। এমনকি দেবতারাও তাঁদের কাছে পরাজিত হন। দেবরাজ ইন্দ্র দেবলোক ফিরে পাওয়ার জন্য আদ্যাশক্তি মহামায়ার তপস্যা শুরু করেন। দেবী সন্তুষ্ট হয়ে আবির্ভূত হলে তাঁর শরীরের কোষ থেকে কৌশিকী নামে এক দেবীর সৃষ্টি হয়। মহামায়ার দেহ থেকে বেরিয়ে আসার সময় সেই দেবী কৃষ্ণবর্ণ ধারণ করেন। এই রূপকেই মা কালীর আদিরূপ বলে মনে করা হয়।
কালীপুজোর ইতিহাস ও নানা রূপ
‘কালী’ শব্দটি এসেছে ‘কাল’ থেকে। এর অর্থ কৃষ্ণবর্ণ বা ঘন কালো রং। পুরাণে দেবী কালীর একাধিক রূপের উল্লেখ রয়েছে। দক্ষিণাকালী, শ্মশানকালী, ভদ্রকালী, রক্ষাকালী, চামুণ্ডা, ছিন্নমস্তা-সহ নানা রূপে পূজিত হন দেবী। বিভিন্ন মন্দিরে তিনি ভবতারিণী, ব্রহ্মময়ী ও আনন্দময়ী নামেও পরিচিত।
বাংলায় প্রথম কালীমূর্তি বা প্রতিমা পুজোর প্রচলন করেন নবদ্বীপের তান্ত্রিক কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ বলে প্রচলিত বিশ্বাস। তার আগে তাম্রপটে বা খোদাই করা ছবিতে দেবীর উপাসনা করা হতো। পরবর্তীকালে নদিয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের আমলে অষ্টাদশ শতকে কালীপুজো আরও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। তান্ত্রিক মতে, অমাবস্যার গভীর রাতে মন্ত্রোচ্চারণের মাধ্যমে দেবীর আরাধনা করা হয়।
কেমন হবে দেবী কালীর প্রতিমা?
সাধারণত চার হাতবিশিষ্ট রূপেই মা কালীর প্রতিমা দেখা যায়। এক হাতে খড়্গ, অন্য হাতে অসুরের কাটা মুণ্ড। বাকি দুই হাতে ভক্তদের বর ও অভয় দেন তিনি। গলায় নরমুণ্ডের মালা, এলোকেশি, ঘন কালো নিরাভরণ শরীর এবং বাইরে বেরিয়ে থাকা রক্তবর্ণ জিভ তাঁর পরিচিত রূপ। বেশিরভাগ প্রতিমায় তাঁকে শিবের বুকের উপর দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। (Kali Puja)
সব মিলিয়ে কালীপুজো শুধু দেবীর আরাধনা নয়, অশুভের বিনাশ এবং শুভ শক্তির জাগরণেরও প্রতীক। নিজের ভিতরের অন্ধকার দূর করে সত্য ও আলোর পথে এগিয়ে যাওয়ার বার্তাই দেয় এই উৎসব।














