বিশ্বায়নের যুগে হ্যালোউইনের ভূত-প্রেতের সাজপোশাক, প্লাস্টিকের কঙ্কাল আর মোমবাতি জ্বালানো জাঁকজমকপূর্ণ কুমড়োর (Jack-o’-lantern) জনপ্রিয়তা ভারতেও বাড়ছে। শহুরে রেস্তোরাঁ থেকে শপিং মলে এখন এই দিনটি ঘিরে বিশেষ পার্টির আয়োজন দেখা যায়। কিন্তু ভারতীয় উৎসবের পঞ্জিকার পাতা উল্টালে দেখা যাবে, ভয়ের সংস্কৃতিকে ছাপিয়ে অদৃশ্য জগৎ, পূর্বপুরুষদের স্মৃতি এবং আলো দিয়ে অন্ধকারকে বরণ করার এক সমৃদ্ধ দার্শনিক পাঠ ভারত পালন করে আসছে হাজার বছর ধরে। এখানে অশরীরী আত্মাকে ভয় পাওয়ার চেয়ে বরং তাঁদের পথ দেখাতে মাটির প্রদীপের আলোয় ঘরের অন্ধকার কোণগুলোকে ভরিয়ে তোলার পরম্পরাই মূল শক্তি। ( Indian Halloween Festival)
এই ঐতিহ্য সবচেয়ে প্রত্যক্ষভাবে ধরা দেয় বাংলার লোকসংস্কৃতিতে। দীপাবলির আগের দিন উদ্যাপিত হওয়া ‘ভূত চতুর্দশী’কে অনেকেই ভালোবেসে ‘বাঙালির হ্যালোউইন’ বলে থাকেন। কথিত রয়েছে, এই রাতে মর্ত্যে নেমে আসেন পূর্বপুরুষদের আত্মারা। তাঁদের পথ দেখাতে এবং একই সাথে অপদেবতাদের ছায়া থেকে গৃহস্থকে রক্ষা করতে বাড়ির মা-কাকিমারা সন্ধ্যায় চোদ্দটি প্রদীপ জ্বালিয়ে দেন বাড়ির আনাচে-কানাচে, জানলার কার্নিশে এবং তুলসীতলায়। দুপুরে চোদ্দ শাক খাওয়ার বৈজ্ঞানিক ও লোকায়ত প্রথাও এই পরিবর্তনের ঋতুতে শরীর ও মনকে সুস্থ রাখার বার্তা দেয়। ( Indian Halloween Festival)
একইভাবে অসমের গ্রামাঞ্চলে কার্তিক সংক্রান্তিতে পালিত ‘কাতি বিহু’ হ্যালোউইনের শীতকালীন আবহের সঙ্গে দারুণভাবে মিলে যায়। অভাবের এই সময়টিতে গ্রামবাসী ধানের খেতে এবং শস্যগোলায় বাঁশের ডগায় আকাশবাতি জ্বালিয়ে দেন। সেই আলোর শিখা পোকা-মাকড় দূর করার পাশাপাশি পরিবারে সৌভাগ্য নিয়ে আসার প্রতীক হিসেবে কাজ করে। ঠিক তেমনই নভেম্বর মাসে পালিত ‘কার্তিক পূর্ণিমা’র রাতে উত্তর ও পশ্চিম ভারতের নদীগুলোর ঘাট ভেসে যায় হাজার হাজার প্রদীপের মৃদু আলোয়, যা রূপকথার চেয়ে কোনও অংশে কম নয়।
তবে ভারতের এই অতিলৌকিক উৎসবের সবচেয়ে নাট্য ও শৈল্পিক রূপ দেখা যায় দক্ষিণ ভারতের মাটিতে। কর্নাটকের উপকূলীয় অঞ্চলের ‘ভূত কোলা’ লোকশিল্পের এক অবিস্মরণীয় নিদর্শন। বংশানুক্রমিক লোকশিল্পীরা সেখানে অদ্ভুত সব পোশাক, মুখে চড়া রঙের প্রলেপ আর ধাতব মুকুট পরে গ্রামের সুরক্ষাদাতা আত্মাদের মূর্ত রূপ দেন। ঢাকের বাদ্য আর আগুনের শিখার সামনে যখন তাঁরা নৃত্য করেন, তখন উপস্থিত জনতা যেন প্রত্যক্ষ করেন বাস্তব ও কল্পনার এক অতিপ্রাকৃতিক মেলবন্ধন। একই ধরণের অনুভূতি জাগায় কেরলের উত্তর মালাবারের ‘তেইয়াম’। চোখ ধাঁধানো রঙের প্রলেপ আর বিশাল শিরস্ত্রাণ পরে যখন তেইয়াম শিল্পী আগুনের ওপর দিয়ে হেঁটে যান, তখন পুরো পরিবেশ আধ্যাত্মিক রহস্যে ভরে ওঠে।
পশ্চিমি হ্যালোউইনের মতো ভারতের এই উৎসবগুলো কোনও সাময়িক বাণিজ্যিক বিনোদন নয়। বরং প্রকৃতি, ঋতু পরিবর্তন, কৃষিকাজ এবং পূর্বপুরুষদের স্মৃতির সাথে লোকশিল্পকে এক সুতোয় বেঁধে রাখার এক অমূল্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। (Indian Halloween Festival)













