ভারতের স্বাধীনতার ইতিহাস বললেই আমাদের মনে পড়ে বিপ্লবীদের রক্তে রাঙা মাটি, মিটিং মিছিল, জেল, অত্যাচার আর ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের কথা। কিন্তু সেই লড়াইয়ের গল্পে এমন কিছু ‘নীরব সৈনিক’ও ছিল, যাদের কথা খুব একটা শোনা যায় না। তারা হলো সামান্য রুটি, বরফি, লাড্ডুর মতো খাবার। ভাবছেন খাবারও আবার কখনও প্রতিবাদের ভাষা হতে পারে? হ্যাঁ ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস বলছে এমনটাই হয়েছে। কীভাবে?
শুকনো রুটি ঘুরত গ্রাম থেকে গ্রামে
১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের আগে উত্তর ভারতের বিভিন্ন গ্রামে হঠাৎ করে চৌকিদারের হাতে পৌঁছে যাচ্ছিল কয়েকটি করে শুকনো রুটি বা চাপাটি। তাঁকে আবার একইভাবে অন্য গ্রামে পাঠাতে বলা হতো। আপাত দৃষ্টিতে দেখে ব্রিটিশটা ভাবল এভাবে বুঝি বিপ্লবীরা নিজেদের মধ্যে গোপন বার্তা চালান করছে। কিন্তু আদতে এর মধ্যে কোনও লিখিত বার্তা ছিল না। তবে এই রহস্যময় যাতায়াত ব্রিটিশ প্রশাসনের মধ্যে যথেষ্ট আতঙ্ক তৈরি করেছিল। কীসের সংকেত ছিল এই চাপাটিতে -তা নিয়ে আজও ইতিহাসে নানা মত রয়েছে। (Food History Behind Indian Freedom)
তিরঙ্গা বরফিতে লুকিয়ে স্বাধীনতার বার্তা
চাপাটিতেই শেষ নয়, মিষ্টিতেও ছিল প্রতিবাদের স্বাদ। ১৯৪০ সালে বারাণসীর মিষ্টির দোকান রাম ভাণ্ডারের মদন গোপাল গোপনে বিপ্লবীদের তথ্য আদানপ্রদানের কাজে তিরঙ্গা বরফি তৈরি করেছিলেন বলে জানা যায়।তখন ব্রিটিশ সরকার জাতীয় পতাকা প্রদর্শনের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল। সেই সময় সরাসরি তিরঙ্গা প্রদর্শন করা ঝুঁকিপূর্ণ হতো। তাই মিষ্টির মধ্যেই যেন লুকিয়ে দেওয়া হলো পতাকার রং। জাফরানের সাহায্যে তৈরি হলো গেরুয়া অংশ, পেস্তা দিয়ে সবুজ এবং ক্ষোয়া ও কাজুবাদাম মিশিয়ে তৈরি হলো সাদা স্তর। ফলে বাইরে থেকে এটি সাধারণ বরফি, কিন্তু রং দেখলেই বোঝা যায়—এ যেন মিষ্টির মধ্যে লুকিয়ে থাকা তিরঙ্গা। এও এক অনন্য প্রতিবাদের ভাষা।
স্বাধীনতার আগে থেকে জাতীয় পতাকার বর্তমান রূপ, কীভাবে তৈরি হলো আজকের তিরঙ্গা?
মিষ্টির দোকান ছিল বিপ্লবীদের ‘মিটিং পয়েন্ট’
ভাবুন তো, আজকের দিনে বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে ক্যাফেতে যাওয়া যতটা স্বাভাবিক, সেই সময় বিপ্লবীদের কাছে মিষ্টির দোকানও অনেকটা তেমনই নিরাপদ জায়গা হয়ে উঠেছিল।ব্যস্ত মিষ্টির দোকানে সারাক্ষণ মানুষের আসা-যাওয়া। ফলে সেখানে দু’জন বা কয়েকজনের দেখা হলে তা নিয়ে বিশেষ সন্দেহ করার কারণ থাকত না। উৎসব বা ধর্মীয় অনুষ্ঠানের সময় ভিড় আরও বাড়ত। ফলে গোপন আলোচনা বা তথ্য আদানপ্রদানের জন্য এমন জায়গা বেশ সুবিধাজনক ছিল। অর্থাৎ, একদিকে মিষ্টি বিক্রি হচ্ছে, অন্যদিকে স্বাধীনতার পরিকল্পনা।
লাড্ডু মানেই ‘বোমা আসছে’
বিপ্লবীদের মধ্যে খাবারকে সংকেত হিসেবে ব্যবহার করার আরও কিছু মজার কাহিনি প্রচলিত রয়েছে। সেইসময় বিভিন্ন মিষ্টিকে অনেকটা মোর্স কোডের মতো ব্যবহার করতেন বিপ্লবীরা। যেমন, ধরুন এক বাক্স লাড্ডু মানেই বোমা আসছে, আবার বাংলার রসগোল্লা বোঝাত বিস্ফোরক দ্রব্যের বড় চালান আসছে। তাই মিষ্টির বাক্স খুলে হয়তো ব্রিটিশ অফিসার ভাবছেন—‘আহা, মিষ্টি!’ তবে বিপ্লবীরা জানেন, বাক্সের ভিতরে আসলে অন্য বার্তা লুকিয়ে আছে। (Food History Behind Indian Freedom)
অর্থাৎ স্বাধীনতার লড়াই যে শুধু বন্দুকের নল বা বিপ্লবীদের স্লোগানেই সীমাবদ্ধ ছিল এমন নয়। কখনও কখনও সেই লড়াই নিঃশব্দে এক হাত থেকে অন্য হাতে ঘুরেছে—চাপাটি, মিষ্টির বাক্স কিংবা তিরঙ্গা বরফির হয়ে। খাবার তখন শুধু পেট ভরানোর জিনিস ছিল না; ছিল প্রতিবাদ, গোপন সংকেত এবং স্বাধীনতার স্বপ্ন বহন করার এক অভিনব মাধ্যম।












