রাজ্য খেলার দুনিয়া দেশ মুশকিল আসান বিদেশ বিনোদন ব্যবসা ও বাণিজ্য লাইফস্টাইল ও স্বাস্থ্য টেক

---Advertisement---

মুঘল দুর্গ আজ স্বাধীন ভারতের প্রতীক, ১৫ অগস্টে কেন লালকেল্লাতেই উত্তোলিত হয় তিরঙ্গা?

Published on: August 15, 2026
National Flag at Red Fort
---Advertisement---

প্রতি বছর ১৫ অগস্ট সকাল হলেই দেশবাসীর নজর চলে যায় দিল্লির লালকেল্লার দিকে (National Flag at Red Fort)। জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন প্রধানমন্ত্রী, তারপর জাতীয় সঙ্গীত, কুচকাওয়াজ এবং দেশবাসীর উদ্দেশে ভাষণ—স্বাধীনতা দিবসের এই ছবি আজ ভারতীয়দের কাছে অত্যন্ত পরিচিত। কিন্তু একটা প্রশ্ন অনেকেরই মনে আসে দিল্লিতে এত ঐতিহাসিক ভবন থাকতে স্বাধীনতা দিবসের মূল অনুষ্ঠানের জন্য লালকেল্লাকেই কেন বেছে নেওয়া হলো? আরও অনেক সৌধ থাকলে কেন লালকেল্লা? জেনে নিন এই প্রতিবেদন থেকে।

স্বাধীনতা দিবসের পতাকা উত্তোলনের জন্য কেন লালকেল্লাকে বেছে নেওয়া হলো? এর উত্তর শুধুমাত্র একটি সরকারি অনুষ্ঠানের ইতিহাসে নেই। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে মুঘল সাম্রাজ্যের উত্থান-পতন, ব্রিটিশ শাসনের প্রতিষ্ঠা, ১৮৫৭-র বিদ্রোহ এবং শেষ পর্যন্ত স্বাধীন ভারতের আত্মপ্রকাশের কাহিনি। ফলে লালকেল্লা আজ শুধু একটি মুঘল স্থাপত্য নয়, বরং ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল।

National Flag at Red Fort: শাহজাহানের দুর্গ, মুঘল সাম্রাজ্যের ক্ষমতার কেন্দ্র

লালকেল্লার ইতিহাস শুরু হয় ১৭শ শতকে। মুঘল সম্রাট শাহজাহান আগ্রা থেকে রাজধানী দিল্লিতে সরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেন। ১৬৩৮ সালের দিকে শুরু হয় নতুন রাজধানী শাহজাহানাবাদ এবং তার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে লালকেল্লা। পরবর্তী সময়ে শাহজাহান ও তাঁর উত্তরসূরিদের আমলে এই দুর্গ হয়ে ওঠে মুঘল শাসনের অন্যতম প্রধান ক্ষমতাকেন্দ্র।

কিন্তু সময় বদলাতে থাকে। মুঘল সাম্রাজ্যের শক্তি ক্রমশ কমে যায়। দিল্লির রাজনীতি ও ক্ষমতার সমীকরণ বদলে যেতে থাকে এবং শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশরা ভারতের ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। এই পালাবদলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী ছিল লালকেল্লা। (National Flag at Red Fort)

১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের সময় শেষ মুঘল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরকে বিদ্রোহীরা প্রতীকী নেতা হিসেবে সামনে আনেন। বিদ্রোহ দমনের পর ব্রিটিশরা তাঁকে গ্রেফতার করে এবং লালকেল্লাতেই তাঁর বিচার হয়। পরে তাঁকে রেঙ্গুনে নির্বাসিত করা হয়। ফলে লালকেল্লা একদিকে মুঘল সাম্রাজ্যের গৌরবের স্মৃতি বহন করে, অন্যদিকে সেই সাম্রাজ্যের পতন ও ব্রিটিশ আধিপত্য প্রতিষ্ঠার ইতিহাসের কথাও বলে।

1000444360

ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গেও জড়িয়ে গেল লালকেল্লা

লালকেল্লার সঙ্গে ভারতের স্বাধীনতার ইতিহাস আরও গভীরভাবে জড়িয়ে যায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর। আজাদ হিন্দ ফৌজ বা ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মির কয়েকজন শীর্ষ আধিকারিকের বিরুদ্ধে বিচার লালকেল্লায় অনুষ্ঠিত হয়। তাঁদের মধ্যে ছিলেন শাহনওয়াজ খান, প্রেমকুমার সেহগল এবং গুরবক্স সিং ঢিঁলো।

এই বিচারকে ঘিরে গোটা দেশে প্রবল জনমত তৈরি হয়েছিল। নেতাজির ‘দিল্লি চলো’ ডাকে গর্জে উঠেছিল ব্রিটিশপীড়িত ভারতীয়রা। বহু ভারতীয়ের কাছে আজাদ হিন্দ ফৌজের সদস্যদের বিচার হয়ে ওঠে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে জাতীয়তাবাদী আবেগের অন্যতম কেন্দ্র। অর্থাৎ যে দুর্গ একসময় ব্রিটিশদের হাতে শেষ মুঘল সম্রাটের পতনের সাক্ষী হয়েছিল, সেই একই জায়গা স্বাধীনতার শেষ পর্যায়ের আন্দোলনেও প্রতীকী গুরুত্ব পেয়ে গেল। (National Flag at Red Fort)

এই ইতিহাসই লালকেল্লাকে অন্য অনেক ঐতিহাসিক স্থাপনার থেকে আলাদা করে দেয়। এটি শুধু মুঘল রাজবংশের স্মৃতি নয়; ভারতীয়দের ক্ষমতা হারানো, পরাধীনতা এবং শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতা অর্জনের দীর্ঘ যাত্রার সঙ্গে এই দুর্গ প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত।

তারপর এল ১৯৪৭

অবশেষে ১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হলো। ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটল। সেই মুহূর্তে দেশের সামনে প্রয়োজন ছিল এমন একটি প্রতীকী স্থান, যেখান থেকে নতুন স্বাধীন ভারতের আত্মপ্রকাশকে তুলে ধরা যায়। লালকেল্লা সেই অর্থে অত্যন্ত শক্তিশালী একটি প্রতীক হয়ে ওঠে।

সরকারি নথি অনুযায়ী, ১৫ অগস্ট মধ্যরাতে সমস্ত ক্ষমতা হস্তান্তরের পর, স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু লালকেল্লার প্রাচীর থেকে ব্রিটিশদের ইউনিয়ন জ্যাক সরিয়ে প্রথম দেশের তিরঙ্গা উত্তোলন করেন ১৯৪৭ সালের ১৬ অগস্ট। পরবর্তী সময়ে ১৫ অগস্টের স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানের সঙ্গে লালকেল্লার প্রাচীর এবং প্রধানমন্ত্রীর পতাকা উত্তোলন স্থায়ীভাবে যুক্ত হয়ে যায়।

আরও পড়ুনঃ লালকেল্লায় বদল স্বাধীনতা দিবসের রীতি, এ বার থাকছে বিশেষ আয়োজন

এরপর ধীরে ধীরে এটিই একটি ঐতিহ্য পরিণত হয়। দেশের প্রধানমন্ত্রী প্রতি বছর স্বাধীনতা দিবসে লালকেল্লার প্রাচীর থেকে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন এবং জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন। ১৯৪৭ থেকে এই ধারাবাহিকতা আজও বজায় রয়েছে। দেশে একাধিকবার সরকার বদল হলেও কোনও সরকার লালকেল্লার বদলে স্বাধীনতা দিবসের সকালে অন্য কোথাও পতাকা উত্তোলন করেনি।

এখানেই লালকেল্লার প্রতীকী শক্তি। যে দুর্গ একসময় মুঘল সাম্রাজ্যের পতন দেখেছে, ব্রিটিশ শক্তির মূল ঘাঁটি হয়ে উঠেছিল; স্বাধীনতার পর সেই একই প্রাচীর হয়ে উঠল জনগণের সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রতীক।

লালকেল্লা শুধু একটি দুর্গ নয়, স্বাধীন ভারতের জীবন্ত দলিল

লালকেল্লা কেন? প্রশ্নটির উত্তর আসলে তার ইট-পাথরের মধ্যে নয়, লুকিয়ে তার ইতিহাসের মধ্যে। মুঘলদের রাজধানীর কেন্দ্র থেকে ব্রিটিশ আধিপত্যের সাক্ষী, বাহাদুর শাহ জাফরের বিচার থেকে আজাদ হিন্দ ফৌজের বিচার—প্রতিটি অধ্যায় লালকেল্লাকে ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত করেছে। (National Flag at Red Fort)

আর স্বাধীনতার পর সেই অর্থই বদলে গেল। আগে যেখানে ব্রিটিশদের ক্ষমতার আস্ফালন ছিল, সেখানে আজ উড়ছে ভারতের তিরঙ্গা। আগে যেখানে পরাধীনতার অধ্যায় লেখা হয়েছিল, সেখান থেকেই স্বাধীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী প্রতি বছর দেশবাসীর উদ্দেশে কথা বলেন। এখন দেশের ৫০০ টাকার নোটও দেখা যায় এই ঐতিহাসিক ভবনের ছবি।

নেহরুর ১৯৪৭ সালের ভাষণেও জাতীয় পতাকাকে স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল। তাই ১৫ অগস্ট লালকেল্লায় পতাকা উত্তোলন নিছক একটি সরকারি রীতি নয়। এটি যেন ইতিহাসের সামনে দাঁড়িয়ে স্বাধীন ভারতের নিজের জায়গা ঘোষণা করা। প্রতিবছর সেই ফেলে আসা পরাধীনতার কালো অধ্যায়কে সমাপ্ত করে স্বাধীনতাকে নতুন করে উদযাপন করা। তাই রাজধানীতে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ভবন থাকলেও স্বাধীনতা দিবসের পতাকা উত্তোলন এবং মূল অনুষ্ঠানের জন্য বেছে নেওয়া হয়েছে লালকেল্লাকেই।


Trishita Roy

স্কুলে পড়াকালীনই সাংবাদিকতার প্রতি আগ্রহ এবং ভালোবাসা থেকে এই পেশায় আসা। সমাজের মানুষের কাছে যেকোনো ঘটনার নির্ভুলভাবে তুলে ধরাই মূল লক্ষ্য। বর্তমানে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনস্থ উইমেন্স কলেজ ক্যালকাটা তে সাংবাদিকতা ও গণজ্ঞাপন বিভাগে স্নাতক স্তরে পাঠরতা। বিনোদন, আন্তর্জাতিক বিষয়ক এবং রাজনৈতিক প্রতিবেদন লেখায় বিশেষ আগ্রহ রয়েছে। অবসর কাটে সিনেমা দেখে, গান শুনে এবং বই পড়ার মাধ্যমে।

Join WhatsApp

Join Now

Join Telegram

Join Now

1 thought on “মুঘল দুর্গ আজ স্বাধীন ভারতের প্রতীক, ১৫ অগস্টে কেন লালকেল্লাতেই উত্তোলিত হয় তিরঙ্গা?”

Leave a Comment