আজ ১৫ অগস্ট, দেশজুড়ে পালিত হচ্ছে ভারতের ৮০তম স্বাধীনতা দিবস। দিল্লির ঐতিহাসিক লালকেল্লায় পতাকা উত্তোলনের পর জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তবে এবারের অনুষ্ঠান ছিল একটু বিশেষ। স্বাধীনতা দিবসের লালকেল্লার অনুষ্ঠানে এই প্রথম সেনাবাহিনীর তরফে ‘বন্দে মাতরম’ গান বাজানো হলো। জাতীয় গানের ১৫০ বছর পূর্তির আবহে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণেও বার বার উঠে এল ‘বন্দে মাতরম’-এর গুরুত্ব। এবারের মূল ভাবনা ছিল ‘যুবশক্তি’ এবং ‘বিকশিত ভারত’। প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট করে দিলেন, ২০৪৭ সালের মধ্যে ভারতকে একটি উন্নত ও আত্মনির্ভর দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে সবচেয়ে বড় ভরসা দেশের তরুণ প্রজন্মই। তাঁর কথায়, দেশের তরুণেরা প্রতিদিন এক থেকে দু’ঘণ্টাও যদি দেশের জন্য ব্যায় করে তাতেই দেশের উন্নতি হবে। (Narendra Modi Independence Day Speech )
‘স্বপ্ন বড় হলে সংকল্পও দৃঢ় হতে হবে’
জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণে লালকেল্লা থেকে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কোনও দেশ যদি পরিষ্কার লক্ষ্য এবং দৃঢ় সংকল্প নিয়ে এগিয়ে যায়, তা হলে একদিন সেই স্বপ্ন বাস্তবে পরিণত হবেই। তাঁর কথায়, স্বপ্ন যত বড় হবে, সেই স্বপ্ন পূরণের জন্য পরিশ্রম ও প্রচেষ্টাও তত বেশি করতে হবে।
গত কয়েক বছরে দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে যে পরিবর্তন এসেছে, তার কথাও তুলে ধরেন মোদি। তাঁর দাবি, খাদি ও অন্যান্য গ্রামাঞ্চলের শিল্প উৎপাদন উল্লেখযোগ্য ভাবে বেড়েছে। একই সঙ্গে মোবাইল পরিষেবা, ইন্টারনেট ব্যবহার এবং ডিজিটাল লেনদেনও কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
দেশের মেট্রো পরিষেবা অনেক বেশি শহরে পৌঁছেছে এবং গণপরিবহণ ব্যবস্থাও আগের তুলনায় শক্তিশালী হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০৪৭-এর লক্ষ্য সামনে রেখে ভারতকে আত্মবিশ্বাসী এবং আত্মনির্ভর হয়ে উঠতে হবে। অন্য দেশের উপর অতিরিক্ত নির্ভর না করে ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’-র ভাবনাকে সামনে রেখে দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর উপর জোর দেন তিনি।
#WATCH | Delhi: Prime Minister Narendra Modi hoists the National Flag at Red Fort on the 80th Independence Day.
— ANI (@ANI) August 15, 2026
The hoisting of the National Flag was synchronised with the 21-Gun Salute by the gunners of the 1721 Field Battery (Ceremonial). The ceremonial battery, utilising the… pic.twitter.com/rbaiIKQpPU
পরমাণু শক্তি থেকে হাইড্রোজেন ট্রেনে এগিয়ে যাওয়ার বার্তা
দেশের পরিকাঠামো ও শক্তিক্ষেত্রে অগ্রগতির কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। ২০৪৭ সালের মধ্যে দেশে ১০০ গিগাওয়াট পরমাণু শক্তি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। পরমাণু শক্তির ক্ষেত্রে আত্মনির্ভরতার দিকেও দেশ এগোচ্ছে বলে তাঁর দাবি।
গ্যাস সরবরাহের ক্ষেত্রেও দেশের অগ্রগতির কথা তুলে ধরেন মোদি। ২০১৪ সালে মাত্র ৭০টি শহরে পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস পৌঁছত। বর্তমানে সেই পরিষেবা প্রায় ৭০০টি শহরে পৌঁছে গিয়েছে বলে জানান তিনি।
রেলপথের বৈদ্যুতিকরণের কাজ সম্পূর্ণ হওয়ার কথাও উল্লেখ করেন মোদি। পাশাপাশি দেশে প্রথম হাইড্রোজেনচালিত ট্রেন চালুর উদ্যোগ নেওয়ার প্রসঙ্গেও কথা বলেন তিনি। (Narendra Modi Independence Day Speech)
শুধু দেশের জন্য উৎপাদন নয়, আন্তর্জাতিক বাজারে ভারতীয় পণ্যের জায়গা তৈরি করার উপরও জোর দেন মোদি। তাঁর বার্তা, বিশ্বমানের পণ্য তৈরি করতে হবে, রফতানি বাড়াতে হবে এবং ভারতীয় সংস্থাগুলিকে বিশ্বজুড়ে পরিচিত ব্র্যান্ড হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
AI-এর যুগে প্রতি বছর ১ কোটি তরুণকে প্রশিক্ষণ
প্রধানমন্ত্রীর এবারের ভাষণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI। তাঁর বক্তব্য, বিশ্ব এমন একটি সময়ের দিকে এগোচ্ছে যেখানে মানুষ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা একসঙ্গে কাজ করবে। AI কাজকে আরও দ্রুত, স্মার্ট, দক্ষ এবং কার্যকর করে তুলতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে ভারতও AI-কে আগামী দিনের বড় সম্ভাবনা হিসেবে দেখছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। তরুণদের এই নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত করে তুলতে বড় ঘোষণা করেন তিনি। প্রতি বছর দেশের ১ কোটি যুবক-যুবতীকে বিশেষ এআই প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যবস্থা সরকার করবে বলেও জানান তিনি।
মোদির মতে, দেশের ভবিষ্যৎ গড়ার ক্ষেত্রে তরুণ প্রজন্মের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাঁদের দক্ষতা ও শক্তিকে কাজে লাগিয়েই ভারতের আগামী লক্ষ্যকে বাস্তবে রূপ দেওয়া সম্ভব। তাই ২০৪৭ সালের ‘বিকশিত ভারত’-এর স্বপ্ন পূরণে যুবসমাজের উপর তাঁর পূর্ণ আস্থা রয়েছে।
এর পাশাপাশি দেশের তরুণ খেলোয়াড়দের আরও এগিয়ে যাওয়ার উৎসাহও দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন অলিম্পিকের মতো বড় মঞ্চে ভারত জাতের আরও উন্নতি করতে পারে সেই জন্য এখন থেকে নতুন প্রজন্মদের খুঁজে তাদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে। যাতে আগামীদিনে বিশ্বে দেশের নাম উজ্জ্বল হয়।
মুঘল দুর্গ আজ স্বাধীন ভারতের প্রতীক, ১৫ অগস্টে কেন লালকেল্লাতেই উত্তোলিত হয় তিরঙ্গা?
নারীশক্তি, কৃষক, শ্রমিক-সকলকে নিয়ে ২০৪৭-এর লক্ষ্য
প্রধানমন্ত্রী শুধু তরুণদের নয়, দেশের নারীশক্তি, কৃষক এবং শ্রমিকদেরও এই উন্নয়নের যাত্রায় সামিল হওয়ার আহ্বান জানান। তাঁর বক্তব্য, প্রত্যেকের সম্মিলিত প্রচেষ্টাতেই ভারতকে ২০৪৭ সালের মধ্যে আরও শক্তিশালী জায়গায় পৌঁছে দেওয়া সম্ভব।
আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও ভারতের অবস্থান যে আগের তুলনায় অনেক শক্তিশালী হয়েছে, সে কথাও তুলে ধরেন মোদী। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ভারতের ক্ষমতা ও সম্ভাবনাকে নতুন করে গুরুত্ব দিতে শুরু করেছে বলে দাবি করেন তিনি। এই অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে বিশ্বমানের উৎপাদন ব্যবস্থা এবং পণ্য তৈরি করাও জরুরি বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। (Narendra Modi Independence Day Speech)
সব মিলিয়ে, লালকেল্লায় স্বাধীনতা দিবস উদযাপনের মঞ্চ থেকে আত্মনির্ভরতা, আধুনিক প্রযুক্তি, উৎপাদন ও তরুণ শক্তিকে সঙ্গে নিয়েই ২০৪৭-এর ‘বিকশিত ভারত’-এর লক্ষ্যে এগিয়ে যাওয়ার ডাক দিলেন প্রধানমন্ত্রী।
উল্লেখ্য, এদিন সকালে প্রথমে রাজঘাটে গিয়ে মহাত্মা গান্ধীর সমাধিতে শ্রদ্ধা জানান প্রধানমন্ত্রী। পরে লালকেল্লায় পৌঁছে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন। ‘বন্দে মাতরম’ এবং জাতীয় সঙ্গীতের মাধ্যমে শুরু হয় স্বাধীনতা দিবসের মূল অনুষ্ঠান। দর্শকাসনেও এ বার তরুণ প্রজন্মের উপস্থিতি ছিল বিশেষ ভাবে চোখে পড়ার মতো। প্রতিবারের মতো এবারও নিজের বক্তব্যের শেষে দর্শকদের মধ্যে গিয়ে সেই সব তরুণ-তরুণীদের সঙ্গে জনসংযোগ করতে, হাত মেলাতে দেখা যায় প্রধানমন্ত্রীকে।













2 thoughts on “লালকেল্লায় প্রথম বার ‘বন্দে মাতরম’, ৮০তম স্বাধীনতা দিবসে প্রধানমন্ত্রীর ভরসা যুবশক্তি”